✍️ ড. লোকমান খান

তেহরানের আজাদি চত্বরে মঙ্গলবার যখন ভোরের আলো ফুটছিল, তখন শহরের বাতাস ছিল অন্যরকম। কোনো আতঙ্কের ছাপ নয়, বরং এক অদ্ভুত প্রশান্তি। বাজারের কোণে চায়ের কাপে চুমুক দেওয়া সাধারণ মানুষটির চোখেমুখে যে দৃঢ়তা ছিল, তা কোনো সমরাস্ত্রের চেয়ে কম শক্তিশালী নয়। আমি দুই দশকের বেশি সময় ধরে বৈশ্বিক রাজনীতি পর্যবেক্ষণ করছি, কিন্তু এবারের মতো ক্ষমতার ভারসাম্য বদলে যেতে আগে কখনো দেখিনি। গত ২৮ শে ফেব্রুয়ারির পর পৃথিবী আর আগের মতো নেই। সেই তারিখটি ইতিহাসের পাতায় এক গভীর ক্ষত বা সম্ভবত এক নতুন মহাকাব্যের সূচনা হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে। ইরান আজ আর কেবল মধ্যপ্রাচ্যের কোনো আঞ্চলিক শক্তি নয়, বরং বিশ্বমঞ্চের চতুর্থ বৃহৎ কেন্দ্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েলের সম্মিলিত আক্রমণ ইরানকে ধ্বংস করতে চেয়েছিল। কিন্তু ফলাফল হয়েছে ঠিক উল্টো। এই যুদ্ধ ইরানের উত্থানকে কেবল ত্বরান্বিতই করেনি, বরং তাকে অপরাজেয় করে তুলেছে। ধ্বংসের যা হওয়ার তা হয়ে গেছে, কিন্তু তেহরানের মেরুদণ্ড ভাঙতে তারা ব্যর্থ হয়েছে। এখন টেবিলের ওপর কেবল পারমাণবিক বিকল্পই অবশিষ্ট আছে, যার ইঙ্গিত ইতিমধ্যে পাওয়া যাচ্ছে। কিন্তু তাতে কি পরিস্থিতির খুব একটা পরিবর্তন হবে? আমি মনে করি না। দুই সপ্তাহের মধ্যে হয়তো আবার যুদ্ধের দামামা বেজে উঠতে পারে। তবে একটি বিষয় নিশ্চিত যে, ইরান এখন মধ্যপ্রাচ্যের ভাগ্যবিধাতা হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করে ফেলেছে।

ইরানের সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিল বুধবার যে বিবৃতি দিয়েছে, তা এক ঐতিহাসিক বিজয়ের দলিল। এই ১০ দফা রূপরেখায় যুক্তরাষ্ট্র নীতিগতভাবে সম্মত হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে লেবানন, ইরাক এবং ইয়েমেনসহ সব ফ্রন্টে যুদ্ধ বন্ধের অঙ্গীকার। চার দশক ধরে চলা অমানবিক নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া এবং ইরানকে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার বিষয়টিও এখানে অন্তর্ভুক্ত। ওমানের সাথে যৌথভাবে হরমুজ প্রণালীর নিয়ন্ত্রণ এবং আঞ্চলিক ঘাঁটি থেকে মার্কিন যুদ্ধসেনা প্রত্যাহার করার শর্তগুলো তেহরানের কৌশলগত শ্রেষ্ঠত্বই প্রমাণ করে। এটি কেবল একটি যুদ্ধবিরতি নয়, বরং একটি সাম্রাজ্যের পিছু হটার স্বীকারোক্তি।

বিগত দিনগুলোতে তথাকথিত ‘রাজা’র ট্রুথ সোশ্যাল পোস্টগুলো আমার নজর কেড়েছে। আমি বিস্ময়ের সাথে লক্ষ্য করেছি যে, একটি পরাশক্তির প্রধান কীভাবে এত নিচে নামতে পারেন। তার পোস্টগুলো ছিল ভারসাম্যহীন এবং নৈতিকভাবে চরম অবক্ষয়ের পরিচায়ক। তিনি সভ্যতা ধ্বংসের হুমকি দিয়েছেন, আবার একই সাথে ধর্মীয় আবেগ নিয়ে খেলা করেছেন। এই উগ্র এবং খামখেয়ালি আচরণ আমেরিকার বিশ্বজোড়া ভাবমূর্তিকে চিরদিনের জন্য কলঙ্কিত করেছে। ইতিহাস এই শব্দগুলোকে কখনো ক্ষমা করবে না। তিনি হয়তো নিজের দেশে এই বিভীষিকাকে সামরিক বিজয় হিসেবে বিক্রি করার চেষ্টা করবেন, কিন্তু বিশ্ববাসীর কাছে তার আর কোনো গ্রহণযোগ্যতা নেই।

সবচেয়ে বড় পরিবর্তনের জায়গাটি হলো পারস্য উপসাগরীয় দেশগুলোর নিরাপত্তা ভাবনা। জিসিসি দেশগুলো এতকাল মনে করত যে ওয়াশিংটনই তাদের একমাত্র রক্ষাকর্তা। কিন্তু এবারের যুদ্ধ তাদের সেই বিশ্বাসের ভিতে কাঁপন ধরিয়ে দিয়েছে। তারা দেখেছে যে বিপদের সময় আমেরিকা কেবল নিজের স্বার্থই দেখে। ফলে আঞ্চলিক নিরাপত্তার জন্য তারা এখন থেকে তেহরানের দিকে ঝুঁকে পড়বে। ইরানের ইতিহাস বলছে তারা কখনো প্রতিবেশী কোনো দেশের ওপর আগে আক্রমণ করেনি। এই অঞ্চলের দেশগুলো এখন বুঝতে পারছে যে ইরানের সাথে সুসম্পর্ক রাখাই তাদের টিকে থাকার একমাত্র পথ। সুরক্ষা এখন আর পশ্চিম থেকে আসবে না, সুরক্ষা আসবে নিজেদের ভেতরের ঐক্য থেকে।

হরমুজ প্রণালীর বিষয়টি এখানে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। ২৮ শে ফেব্রুয়ারির আগে এটি ছিল একটি উন্মুক্ত জলপথ। কিন্তু এখন এর নিয়ন্ত্রণ পুরোপুরি ইরানের হাতে। তেহরান এখন এই পথে চলাচলকারী জাহাজগুলোর ওপর শুল্ক আরোপ করার সক্ষমতা রাখে। এটি কেবল ভূ-রাজনীতি নয়, এটি একটি বিশাল অর্থনৈতিক বিজয়। চার দশক পর ইরান যখন বিশ্ববাজারে স্বাভাবিক দামে তেল বিক্রি শুরু করবে, তখন তাদের অর্থনীতিতে যে জোয়ার আসবে তা কল্পনা করা কঠিন নয়। ধ্বংস হওয়া স্থাপনাগুলো আবার গড়ে উঠবে। আমি নিশ্চিত যে চীন এই পুনর্গঠন প্রক্রিয়ায় সবচেয়ে বড় অংশীদার হিসেবে আবির্ভূত হবে। তেহরানের অর্থনীতি তখন এক নতুন উচ্চতায় পৌঁছাবে।

অনেকে আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির পারমাণবিক অস্ত্র বিরোধী ফতোয়ার কথা বলেন। আমি মনে করি আজ আর সেই বিতর্কের কোনো অবকাশ নেই। ইরান যে বিজয় অর্জন করেছে তা কোনো নির্দিষ্ট মরণাস্ত্রের ওপর নির্ভর করে নয়, বরং তাদের জাতীয় সংহতির ওপর ভিত্তি করে। যুদ্ধের আগে ইরানি সমাজ কিছুটা বিভক্ত ছিল। একটি অংশ হয়তো ভেবেছিল পশ্চিমা গণতন্ত্র তাদের মুক্তি দেবে। কিন্তু ‘রাজার’ রক্তপিপাসু বার্তাগুলো তাদের চোখ খুলে দিয়েছে। তারা দেখেছে যে তথাকথিত গণতন্ত্রের প্রবক্তারা তাদের সবাইকে হত্যা করতেও দ্বিধা করত না। আজ ইরানি জাতি তাদের সরকারের সাথে আগের চেয়ে অনেক বেশি ঐক্যবদ্ধ। তারা বুঝেছে যে তাদের নিজস্ব শাসনব্যবস্থা বাইরের কোনো নীল নকশার চেয়ে হাজার গুণ শ্রেয়।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এখান থেকে অনেক কিছু শেখার আছে। আমাদের দেশের মানুষ যদি ইরানের সাধারণ মানুষের দেশপ্রেম এবং ধৈর্য লক্ষ্য করত, তবে তারা বুঝতে পারত জাতির শক্তি কোথায় থাকে। ইরানিদের ওপর অবর্ণনীয় চাপ ছিল, কিন্তু তারা শান্ত ছিল। তাদের সরকারের সাথে মতভেদ থাকতে পারে, কিন্তু বিদেশের কাছে তারা নিজেদের আত্মাকে বিক্রি করে দেয়নি। তাদের ধর্মীয় বিশ্বাস এবং আকিদা ছিল ইস্পাতকঠিন। বিদেশের হুমকি-ধমকিতে তারা মাথানত করেনি। তাদের আশেপাশে অনেক দেশ আছে যারা সামান্য চাপে বিদেশী শক্তির পায়ে লুটিয়ে পড়ে, কিন্তু ইরানিরা দেখিয়ে দিয়েছে কীভাবে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়।

সামনে হয়তো আরও কঠিন সময় আসছে। যুদ্ধ আবার শুরু হতে পারে। ধ্বংসলীলা আরও বাড়তে পারে। কিন্তু তাতে চূড়ান্ত ফলাফলের কোনো পরিবর্তন হবে না। একটি নতুন মধ্যপ্রাচ্যের জন্ম হয়েছে যেখানে তেহরানই হবে কেন্দ্রবিন্দু। মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের সূর্যাস্ত এখন কেবল সময়ের ব্যাপার। একজন ইরানি যখন তার জানালার বাইরে তাকিয়ে দূরের দিগন্ত দেখে, তখন সেখানে কেবল রক্তিম আভা নয়, বরং এক নতুন ভোরের ইঙ্গিত পায়। ইরান এই যুদ্ধে জয়ী হয়েছে কারণ তারা হারতে শেখেনি। তারা জয়ী হয়েছে কারণ তারা জানত যে সত্য এবং ন্যায়ের লড়াইয়ে পরাজয় নেই।

পরিশেষে বলতে চাই, যারা মনে করেছিলেন ইরানকে ভয় দেখিয়ে বা নিষেধাজ্ঞার জালে আটকে রেখে নিঃশেষ করা যাবে, তারা ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ভুলটি করেছেন। ইরানের এই বিজয় আসলে নির্যাতিত এবং অবহেলিত জাতিগুলোর বিজয়। এটি প্রমাণ করে যে যদি মনোবল অটুট থাকে, তবে বিশ্বের বৃহত্তম সামরিক শক্তিকেও হঠিয়ে দেওয়া সম্ভব। তেহরান আজ যে অবস্থানে দাঁড়িয়েছে, সেখান থেকে পিছু হটার কোনো পথ নেই। বিশ্ব এখন এক নতুন শক্তির উত্থান দেখছে, যা আগামী কয়েক দশক ধরে বৈশ্বিক রাজনীতির গতিপথ নির্ধারণ করবে। এটিই বাস্তবতা।


Discover more from LK INNOVATE

Subscribe to get the latest posts sent to your email.

Leave a comment

Trending

Discover more from LK INNOVATE

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading