✍️ ড. লোকমান খান
২০২৪-এর জুলাই। ক্যালেন্ডারের পাতায় এটি কেবল একটি মাস নয়, বরং বাংলাদেশের ইতিহাসের এক মহাকাব্যিক সন্ধিক্ষণ। দীর্ঘ দেড় দশকের একটি পাথরচাপা নিস্তব্ধতাকে ভেঙে চুরমার করে দিয়েছিল এ দেশের তরুণ প্রাণগুলো। সেই উত্তাল দিনগুলোতে রাজপথ যখন রক্তে রঞ্জিত হচ্ছিল, তখন জাতি দেখেছিল এক অভূতপূর্ব স্থাপত্যশৈলী—যাকে আমরা ‘গণআকাঙ্ক্ষার পুনর্গঠন’ বলতে পারি। কিন্তু আজ ২০২৬-এর এই মধ্যগগণে দাঁড়িয়ে যখন পেছন ফিরে তাকাই, তখন মনের কোণে একটি সুতীব্র সংশয় উঁকি দেয়: আমরা কি আসলেই একটি নতুন রাষ্ট্র নির্মাণ করছি, নাকি পুরোনো জীর্ণ প্রাসাদের ফাটলগুলোতে কেবল নতুন রঙের প্রলেপ লাগিয়ে নিজেদের সান্ত্বনা দিচ্ছি?
জুলাই বিপ্লবের মূল কারিগর ছিল এ দেশের ছাত্র-জনতা। ১৪০০-এর অধিক তাজা প্রাণের বিনিময়ে যে ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপিত হয়েছিল, আজ একদল রাজনৈতিক সুবিধাবাদী তাকে কেবল ‘কোটা সংস্কার আন্দোলন’ বলে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করার ধৃষ্টতা দেখাচ্ছে। বিশেষ করে বিএনপির একদল অতি-উৎসাহী অনুসারীর আচরণ দেখলে মনে হয়, ৫ই আগস্টের বিপ্লব যেন কোনো জাদুমন্ত্রে আকাশ থেকে পড়া এক ‘বোনাস’, যার ফল ভোগ করার একক ইজারা কেবল তাদেরই। অথচ ইতিহাসের নির্মম সত্য হলো, যখন ছাত্ররা বুলেটের সামনে বুক পেতে দিচ্ছিল, তখন অনেক বড় বড় ‘মাস্টারমাইন্ড’ নিরাপদ আশ্রয়ে বসে হিসেব কষছিলেন—পাল্লা কোন দিকে ভারি হয়। আজ সেই আত্মত্যাগের উত্তরাধিকারকে ‘লাওয়ারিশ’ ভাবার ধৃষ্টতা দেখানোর পরিণাম কখনো শুভ হতে পারে না।
একজন লেখক ও শিক্ষক হিসেবে দীর্ঘ সময় ধরে এ দেশের ক্ষমতার পালাবদল দেখেছি। ক্ষমতার অলিন্দে যারা থাকেন, তারা প্রায়শই ভুলে যান যে রাষ্ট্রের কাঠামো জনগণের আস্থার ওপর দাঁড়িয়ে থাকে। ২০২৪-এর সেই গণঅভ্যুত্থান ছিল একটি জীর্ণ সামাজিক চুক্তির অবসান এবং একটি নতুন স্থাপত্যের নকশা। কিন্তু আজ সেই নকশা বাস্তবায়নের বদলে আমরা দেখছি এক অদ্ভুত দড়ি টানাটানি।
রাষ্ট্র মেরামতের প্রথম স্তম্ভ হওয়া উচিত ছিল সুশাসন। কিন্তু শুরুতেই একটি বড় ভুল হয়ে গেছে বলে আমি মনে করি। ৫ই আগস্টের সেই মাহেন্দ্রক্ষণে যখন ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থার পতন হলো, তখন বিপ্লবী সরকার গঠন না করে তথাকথিত ‘সাংবিধানিক ধারাবাহিকতার’ ফাঁদে পা দেওয়া ছিল ছাত্রদের প্রথম কৌশলগত ভুল। বেগম খালেদা জিয়ার উপলব্ধি উপেক্ষা করে একটি ‘জগাখিচুড়ি’ শাসনব্যবস্থা বেছে নেওয়া হয়েছিল, যার ফলে ফ্যাসিবাদী সংবিধানের প্রেতাত্মা আজও আমাদের তাড়া করে ফিরছে।
আজ যখন বিএনপির বন্ধুরা সংবিধানের দোহাই দিয়ে ছাত্রদের তুচ্ছতাচ্ছিল্য করেন, তখন প্রশ্ন জাগে—এই সংবিধান অনুযায়ী কি শেখ হাসিনা এখনো নিজেকে প্রধানমন্ত্রী দাবি করার সুযোগ পাচ্ছেন না? যে ফ্যাসিবাদী আইনি কাঠামো ১৫ বছর ধরে বিরোধী দলকে পিষে মেরেছে, সেই একই কাঠামোকে সুরক্ষা দেওয়ার জন্য আজ বিএনপির কেন এই প্রাণান্তকর চেষ্টা? উত্তরটি পরিষ্কার: তারা ক্ষমতার এমন একটি সিংহাসন চায়, যেখানে বসলে আগের শাসকের মতোই নিরঙ্কুশ কর্তৃত্ব ভোগ করা যায়। সংস্কার নয়, বরং গদি দখলই যেন মুখ্য উদ্দেশ্য।
বাংলাদেশের সমাজ কাঠামোর গভীরে ধর্ম ও ঐতিহ্যের এক সুদৃঢ় বন্ধন বিদ্যমান। জুলাই বিপ্লব সফল হয়েছিল কারণ সেখানে কওমি মাদ্রাসার ছাত্র থেকে শুরু করে সাধারণ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী—সবাই এক কাতারে দাঁড়িয়েছিল। এটি ছিল এক আধ্যাত্মিক ও রাজনৈতিক মেলবন্ধন। কিন্তু অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এবং পরবর্তী রাজনৈতিক মেরুকরণে সেই ভারসাম্য রক্ষার ক্ষেত্রে এক ধরনের শৈথিল্য লক্ষ্য করা গেছে। প্রফেসর ইউনূসের সরকার তাঁর মজ্জাগত ‘নরম’ স্বভাবের কারণে দেশি-বিদেশি কুশীলবদের স্বার্থ রক্ষায় ব্যস্ত হয়ে পড়েছিল, যেখানে গণমানুষের ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক আবেগ উপেক্ষিত হয়ছিল।
অন্যদিকে, বিএনপি তাদের চিরাচরিত ‘ধরি মাছ না ছুঁই পানি’ নীতি অবলম্বন করছে। তারা একদিকে ইসলামী শক্তির সমর্থন চায়, অন্যদিকে ভারতীয় প্রভাব বলয় ও তথাকথিত সেক্যুলার শক্তির কাছে নিজেদের গ্রহণযোগ্যতা প্রমাণের চেষ্টা চালাচ্ছে। এই দ্বিমুখী নীতি স্থাপত্যের সেই নড়বড়ে পিলারের মতো, যা সামান্য আঘাতেই ধসে পড়তে পারে। ভারতের দিকে অতিরিক্ত ঝুঁকে পড়ার যে প্রবণতা বিএনপির কিছু নেতার মধ্যে দেখা যাচ্ছে, তা প্রকারান্তরে আওয়ামী লীগের ব্যর্থ কৌশলেরই কার্বন কপি।
তৃতীয় ও সবচেয়ে দৃশ্যমান স্তম্ভটি হলো অর্থনীতি। আগস্টের পর দেশের মানুষ আশা করেছিল চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি আর সিন্ডিকেটের অবসান ঘটবে। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে দেখা গেল, কেবল ‘মালিকানা’ পরিবর্তন হয়েছে। ১৫ বছর যারা ক্ষেতে-খামারে লুকিয়ে বেরিয়েছেন, তারা রাতারাতি ‘এলাকার রাজা’ বনে গেছেন। আওয়ামী লীগের রেখে যাওয়া শূন্যস্থানে বিএনপির সিন্ডিকেটগুলো জেঁকে বসলো। ডাল-চাল-পেঁয়াজের বাজারে যে সিন্ডিকেট আগে ‘জয় বাংলা’ বলত, তারা ‘বাংলাদেশ জিন্দাবাদ’ বলে জনগণের পকেট কাটতে শুরু করলো।
প্রফেসর ইউনূসের সরকার ১৮ মাস ধরে একটি অদৃশ্য সুতোয় ঝুলে ছিল। একদিকে ফ্যাসিবাদী প্রশাসনের অবশিষ্টাংশ, অন্যদিকে ক্ষমতার জন্য মরিয়া বিএনপি। এই দড়ি টানাটানির খেলায় স্থিতিশীলতা থমকে দাঁড়িয়েছিল, আর মধ্যস্বত্বভোগীরা তাদের আখের গুছিয়ে নিচ্ছিল। সালাহউদ্দিন আহমেদের নেতৃত্বে বিএনপির যে রূপ আজ সামনে আসছে, তা জনগণের কাছে এক ভীতিকর বার্তা দিচ্ছে। তারেক রহমানের দীর্ঘ নীরবতা বা কৌশলগত অবস্থান পরিস্থিতিকে আরও ঘোলাটে করেছে।
একটি রাষ্ট্রের সংবিধান মূলত তার স্থাপত্যের নীল নকশা, যা রচিত হয় মানুষের অধিকার রক্ষা ও জনকল্যাণের মহান ব্রত নিয়ে। কিন্তু গত দেড় দশকে বাংলাদেশের অভিজ্ঞতা ছিল তিক্ত; এই পবিত্র দলিলটি জনমানুষের আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন হওয়ার বদলে একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর ‘রাজনৈতিক বর্ম’ বা রক্ষাকবচে পরিণত হয়েছিল। বেগম খালেদা জিয়া অত্যন্ত দূরদর্শীভাবে এই সংবিধানকে আওয়ামী লীগের ‘দলীয় ইশতেহার’ হিসেবে অভিহিত করেছিলেন এবং দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে ঘোষণা দিয়েছিলেন যে, জনগণের সরকার প্রতিষ্ঠিত হলে এই জীর্ণ কাঠামোকে ছুড়ে ফেলে দেওয়া হবে। একটি ত্রুটিপূর্ণ ও একপাক্ষিক ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে কখনো ইনসাফভিত্তিক রাষ্ট্রের ইমারত গড়া সম্ভব নয়—এই ধ্রুব সত্যটি তখন বিএনপি ও তার মিত্ররা অনুধাবন করতে পেরেছিল।
অথচ আজ রাজনীতির কী অদ্ভুত সেলুকাস! আমরা অবাক বিস্ময়ে দেখছি, ব্যারিস্টার আন্দালিব রহমান পার্থ সাহেবরা যখন পার্লামেন্টে দাঁড়িয়ে এই সংবিধান সমুন্নত রাখার পক্ষে সওয়াল করেন, তখন তাদের বিএনপির চেয়েও বড় ‘সংবিধান দরদী’ বলে ভ্রম হয়। অথচ ইতিহাসের পাতায় এবং ভিডিওর সংরক্ষিত নথিতে আজও অম্লান হয়ে আছে সেই দিনগুলোর কথা, যখন খোদ মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সাহেবসহ এই নেতারাই সংবিধানকে প্রত্যাখ্যান করে রাজপথে সোচ্চার হয়েছিলেন। ক্ষমতার অলিন্দে পা রাখার আগেই কি তবে তারা এক ধরনের ‘রাজনৈতিক বিস্মৃতি’ বা স্মৃতিভ্রমের শিকার হলেন? যে সংবিধানকে একসময় তারা বিষাক্ত ও অগণতান্ত্রিক বলে ছুড়ে ফেলার দাবি জানিয়েছিলেন, আজ সেই একই দলিল তাদের কাছে কোন জাদুমন্ত্রে ‘পবিত্র ধর্মগ্রন্থের’ মর্যাদা পাচ্ছে? বিএনপির নিজস্ব ‘৩১ দফা’ সংস্কার প্রস্তাবে সংবিধান নিয়ে যে আমূল পরিবর্তনের অঙ্গীকার ছিল, আজ কি তবে সেই প্রতিশ্রুতি কেবলই নির্বাচনী কৌশলের এক ফাঁপা বুলি হয়ে রইল? ক্ষমতার মরীচিকা কি জুলাইয়ের রক্তাক্ত ম্যান্ডেটের চেয়েও তাদের কাছে বড় হয়ে উঠল?
পরিশেষে বলতে চাই, রাষ্ট্র কোনো খেলনা নয় যে একবার ভাঙলে আবার জোড়া দেওয়া যাবে না। তবে ভাঙার পর যদি আপনি সেই পুরনো লোনা ধরা ইঁট দিয়েই নতুন ভবন গড়তে চান, তবে তা ধসে পড়া কেবল সময়ের ব্যাপার। বিএনপি আজ ভাবছে আওয়ামী লীগ হাওয়ায় মিলিয়ে গেছে। কিন্তু ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, কৌশলগত দিক থেকে আওয়ামী লীগ একটি ভয়ংকর শিকারি। আজ যারা বিএনপি করে দাপট দেখাচ্ছেন, তারা ভুলে যাচ্ছেন যে আওয়ামী লীগের লগি-বৈঠার তাণ্ডব দেখার অভিজ্ঞতা এই বিএনপি’র হয়েছিল।
যদি বিএনপি মনে করে যে ২০২৪-এর বিপ্লব কেবল তাদের ক্ষমতায় বসানোর একটি সিঁড়ি ছিল, তবে তারা চরম ভুল করছে। ছাত্র-জনতা আজ যে মোহভঙ্গের শিকার হচ্ছে, তা আগ্নেয়গিরির লাভার মতো বিস্ফোরিত হতে পারে। আওয়ামী লীগ আবারও মাঠে নামবে, এবং তখন বিএনপির এই ‘দুগ্ধপোষ্য শিশু’ সমতুল্য রাজনৈতিক কৌশলের অধিকারীরা মহা সংকটে পড়বে। মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ হওয়ার পরিণাম হবে ভয়াবহ।
বিএনপির সামনে এখন এক বিশাল ঐতিহাসিক সুযোগ। জুলাই সনদের সেই ইনসাফ কায়েমের স্বপ্নকে ধ্রুবতারা বানিয়ে তারা যদি পথ চলতে পারে, তবে তা কেবল দলের জন্য নয়, বরং গোটা জাতির জন্য এক নতুন ভোরের সূচনা করবে। ছাত্রদের সেই আত্মত্যাগকে সম্মানের সাথে আলিঙ্গন করে তারা যদি নিজেদের পুনর্গঠিত করতে পারে, তবে তারাই হতে পারে আগামীর আধুনিক ও বৈষম্যহীন বাংলাদেশের প্রধান কারিগর। জুলাইয়ের শহীদদের পবিত্র আমানতকে ধারণ করে এক অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনীতির পথে হাঁটাই হবে সময়ের দাবি, যা আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতিকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যাবে।
আমাদের সামনে এখন ধ্বংসস্তূপ নয়, বরং রাষ্ট্র পুনর্গঠনের এক নিখুঁত স্থাপত্যের নকশা। এই স্থাপত্যটি সগৌরবে মাথা উঁচু করে দাঁড়াবে কি না, তা আমাদের সম্মিলিত রাজনৈতিক প্রজ্ঞার ওপর নির্ভর করছে। আমরা যদি সংকীর্ণতা কাটিয়ে উদারতার পরিচয় দিতে পারি, তবে এই ভিত্তিপ্রস্তরটিই হবে একটি সমৃদ্ধ ও স্থিতিশীল বাংলাদেশের অপরাজেয় প্রতীক। আজ সঠিক সিদ্ধান্ত নিলে আগামীর প্রজন্ম আমাদের এক নতুন ও সফল স্থাপত্যের স্থপতি হিসেবে স্মরণ করবে।






Leave a comment