✍️ ড. লোকমান খান
৭ এপ্রিল ২০২৬
একটি পুড়ে যাওয়া কাঠের পেন্সিল আর কয়েক টুকরো ছিন্নভিন্ন রঙিন জামা। তেহরানের সেই প্রাথমিক বালিকা বিদ্যালয়ের ধ্বংসস্তূপের নিচে এখন কেবল ভারী স্তব্ধতা বিরাজ করছে। ১৭০টি কচি প্রাণের স্পন্দন থেমে গেছে টমাহক মিসাইলের প্রচণ্ড আঘাতে। আমি যখন এই ধ্বংসলীলার খবর পাচ্ছিলাম, তখন বারবার মনে হচ্ছিল, সভ্যতার মুখোশ পরা আধুনিক বিশ্ব আসলে কতটা বর্বর হতে পারে। ২৮ ফেব্রুয়ারির সেই ভোরটি কেবল কয়েকশ শিশুর মৃত্যু ঘটায়নি, বরং আন্তর্জাতিক সম্পর্কের তথাকথিত নৈতিকতাকে চিরতরে কবর দিয়ে দিয়েছে। ইরান সরকারের শীর্ষ নেতৃত্বকে হত্যার নেশায় মত্ত হয়ে যারা শিশুদের ওপর বোমা বর্ষণ করে, তারা আসলে এক গভীর হতাশায় নিমজ্জিত। এই হতাশা কোনো সাধারণ ব্যর্থতা নয়, বরং একটি দীর্ঘমেয়াদী ষড়যন্ত্রের বালির বাঁধ ভেঙে পড়ার আর্তনাদ।
আমি দীর্ঘকাল ধরে এই অঞ্চলের ভূ-রাজনীতি পর্যবেক্ষণ করছি। ফেসবুকে এবং আমার ওয়েবসাইটের পাতায় আমি বারবার লিখেছি যে, পারস্যের এই ভূমি কোনো সাধারণ ভূখণ্ড নয়। এটি একটি চেতনার নাম। সম্প্রতি তথাকথিত ‘কিং’ নিজের অজান্তেই যেসব সত্য ফাঁস করে দিয়েছেন, তা শুনলে আঁতকে উঠতে হয়। জুন মাসে ইরানে যে গণ-অভ্যুত্থানের চেষ্টা হয়েছিল, তাকে আমরা অনেকেই শুরুতে স্বতঃস্ফূর্ত মনে করেছিলাম। কিন্তু এখন বেরিয়ে আসছে অন্য চিত্র। কিং নিজেই স্বীকার করেছেন যে, কুর্দি বিদ্রোহীদের মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ মারণাস্ত্র ও গোলাবারুদ ইরানে পাচার করা হয়েছিল। লক্ষ্য ছিল একটাই, সাধারণ মানুষের অসন্তোষকে পুঁজি করে পুলিশ ও নিরাপত্তা বাহিনীর ওপর সশস্ত্র হামলা চালানো। তারা সফল হয়েছিল পুলিশকে পাল্টা গুলি ছুড়তে বাধ্য করতে। প্রচুর হতাহত হয়েছে, রক্তে ভেসেছে তেহরানের রাজপথ। চল্লিশ বছরের অর্থনৈতিক অবরোধের মধ্যে থাকা একটি সমাজে সমস্যা থাকা স্বাভাবিক, কিন্তু সেই সমস্যাকে গৃহযুদ্ধে রূপ দেওয়ার যে নীল নকশা কিং তৈরি করেছিলেন, তা শেষ পর্যন্ত ব্যর্থ হয়েছে। কয়েক হাজার মানুষের মৃত্যুতে তারা উল্লসিত হয়েছিল, তাদের পদলেহী গণমাধ্যমগুলো মৃতের সংখ্যা পঞ্চাশ হাজার বলে চিৎকার করেছিল কেবল একটি প্রত্যাশায়—রেজিম চেঞ্জ বা শাসন ব্যবস্থার পতন। কিন্তু তা হয়নি। ইরানের মাটি ও মানুষ তাদের সেই স্বপ্নকে ধুলোয় মিশিয়ে দিয়েছে।
কিং এখন হিতাহিত জ্ঞান হারিয়েছেন। তাঁর ভাষা এখন কোনো রাষ্ট্রনায়কের মতো নয়, বরং রাস্তার মাস্তানের মতো শোনায়। যখন কোনো বড় শক্তি আদর্শিকভাবে পরাজিত হয়, তখন তারা সামরিক হিংস্রতার পথ বেছে নেয়। ২৮ ফেব্রুয়ারির সেই কাপুরুষোচিত বিমান হামলার পর কিং ভেবেছিলেন ইরান হাঁটু গেড়ে ক্ষমা চাইবে। কিন্তু তেহরান উল্টো পথ বেছে নিয়েছে। তারা হরমুজ প্রণালী বন্ধ করে দিয়েছে। এই এক পদক্ষেপে পুরো বিশ্ব অর্থনীতি এখন খাদের কিনারায়। সারা পৃথিবীতে জ্বালানি সংকট শুরু হয়েছে। আমি জানি না সাধারণ মানুষ এটা কতটা বুঝতে পারছেন, কিন্তু বিশ্ব অর্থনীতি ভেঙে পড়ার এই দৃশ্য আমি স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি। কিং এখন ৪৮ ঘণ্টার আল্টিমেটাম দিচ্ছেন। তিনি হুমকি দিয়েছেন ইরানের সমস্ত ব্রিজ, পাওয়ার প্ল্যান্ট আর পানি শোধনাগার ধ্বংস করে দেওয়ার। এটা কোনো যুদ্ধ নয়, এটা একটা গোটা জাতিকে নিশ্চিহ্ন করার দম্ভ। কিন্তু ইরান পাল্টা থ্রেট করে বলেছে, তারা হার মানবে না। যারা ইরানের ওপর আক্রমণের জন্য নিজেদের ভূখণ্ড ছেড়ে দিয়েছে, তাদের পরিকাঠামো ধ্বংস করতে ইরানের এক মুহূর্ত সময় লাগবে না। মধ্যপ্রাচ্য কি তবে আবার সেই প্রাচীন মরুভূমি যুগে ফিরে যাবে? আমার হৃদয়ে এখন কেবল এই শঙ্কা।
আসুন আমরা সবাই মিলে প্রার্থনা করি যেন তেমন ভয়ংকর কিছু না ঘটে। তবুও আমাদের নির্মম সত্যটা বলতে হবে। পশ্চিম এবং তাদের কিছু সুন্নি দোসররা ইরানকে একটি কঠোর ধর্মীয় একনায়কতন্ত্রী রাষ্ট্র হিসেবে তুলে ধরে। তারা ইরানকে মধ্যপ্রাচ্যের সন্ত্রাসী বলে গালি দেয়। অথচ বাস্তবতা হলো, ইরানিরা এই অঞ্চলের সবচেয়ে প্রাচীন এবং শিক্ষিত জাতি। ইতিহাসের পাতা উল্টে দেখুন। গত কয়েক শতাব্দীতে তারা নিজের থেকে প্রতিবেশী কোনো দেশকে আক্রমণ করেনি। অথচ বারবার তারাই আক্রান্ত হয়েছে। সাদ্দাম হোসেন থেকে শুরু করে আজকের এই সাম্রাজ্যবাদী শক্তি, সবাই তাদের ওপর হামলে পড়েছে। কিন্তু কেউ তাদের পরাজিত করতে পারেনি। কেউ কেউ হয়তো সাময়িকভাবে ইরানের মাটিতে পা রেখেছে, কিন্তু সেই জয় তারা ধরে রাখতে পারেনি। পারস্যের এই রুক্ষ মাটি বারবার দখলদারদের গিলে খেয়েছে। এটাই তাদের ইতিহাস, এটাই তাদের ঐতিহ্য।
পশ্চিমের চোখে ইরানের সবচেয়ে বড় অপরাধ কী? আমি মনে করি, তাদের বড় অপরাধ হলো তারা পশ্চিমের আধিপত্য বা হেজিমনি মেনে নেয় না। তারা কারো দয়া বা দাক্ষিণ্যের ওপর টিকে থাকতে চায় না। তার চেয়েও বড় কথা, ইরান বুক ফুলিয়ে ফিলিস্তিনিদের পাশে দাঁড়ায়। ইসরায়েলের আগ্রাসনের বিরুদ্ধে তারা যখন উচ্চকণ্ঠ হয়, তখন পশ্চিমের স্বার্থে আঘাত লাগে। ঠিক এর উল্টো চিত্র আমরা দেখতে পাই সুন্নি গালফ দেশগুলোর ক্ষেত্রে। তারা নিজেদের নিরাপত্তা এবং ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে পশ্চিমের পদতলে নিজেদের সঁপে দিয়েছে। তারা ফিলিস্তিনের রক্ত দেখেও না দেখার ভান করে। এই দাসত্বের কারণেই তারা পশ্চিমের এত প্রিয়। কিন্তু ইরান সেই পথে হাঁটেনি। তারা স্বনির্ভরতা আর আত্মমর্যাদার পথ বেছে নিয়েছে। যে জাতি মহাকাশে স্যাটেলাইট পাঠায় আর আধুনিক প্রযুক্তিতে স্বয়ংসম্পূর্ণ হওয়ার স্বপ্ন দেখে, তাদের এভাবে মিসাইল মেরে দমিয়ে রাখা অসম্ভব।
কিংয়ের এই আস্ফালন আসলে একটি ক্ষয়িষ্ণু সাম্রাজ্যের শেষ চিৎকার। আমেরিকা এবার পরাজিত হবেই। ইরানের ইতিহাস আমাদের সেই সাক্ষ্য দেয়। এই যুদ্ধ শেষ পর্যন্ত কোথায় গিয়ে ঠেকবে, তা নিয়ে আমি গভীর চিন্তিত। হয় পুরো বিশ্ব ব্যবস্থা ভেঙে পড়বে, মধ্যপ্রাচ্য মানচিত্র থেকে মুছে যাবে, আর না হয় একটি প্রপার বাইপোলার বিশ্ব বা দ্বিমেরু কেন্দ্রিক বিশ্ব শুরু হবে। যেখানে একদিকে থাকবে আমেরিকা আর ইউরোপের দম্ভ, আর অন্যদিকে গড়ে উঠবে রাশিয়া, চীন ও ইরানের একটি শক্তিশালী বলয়।
যুদ্ধের দামামা বাজছে। এই সংকটময় মুহূর্তে আমি কেবল এটাই দেখতে পাচ্ছি যে, পারস্যের প্রতিরোধ কেবল একটি দেশের লড়াই নয়, এটি সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে বিশ্ব মানবতার টিকে থাকার লড়াই। কিং হয়তো মিসাইল ছুড়তে পারেন, কিন্তু একটি প্রাচীন সভ্যতার তেজকে কোনোভাবেই নিভিয়ে দিতে পারবেন না। ইতিহাসে কোনো দম্ভই চিরস্থায়ী হয়নি, কিংয়ের এই উন্মাদনাও হবে না। এখন সময় কেবল ধৈর্য আর চরম প্রতিরোধের। পারস্যের আকাশ হয়তো এখন মেঘলা, কিন্তু মেঘের ওপাশেই সূর্যের নতুন দিন অপেক্ষা করছে। আমরা কি সেই দিনটি দেখার জন্য প্রস্তুত? সময় খুব দ্রুত ফুরিয়ে আসছে। আমাদের প্রার্থনা হোক শান্তির জন্য, কিন্তু সত্যের সাথে কোনো আপস নয়। সাম্রাজ্যবাদের পতন অবধারিত, পারস্য কেবল সেই পতনের সূত্রপাত ঘটাচ্ছে।






Leave a comment