✍️ ড. লোকমান খান
বিশ্লেষণ
৬ এপ্রিল ২০২৬
আজকের সংবাদপত্রগুলোর অনলাইন এডিশনে চোখ রেখে দীর্ঘক্ষণ স্তব্ধ হয়ে বসে ছিলাম। জানালার বাইরে রোদের ঝিলিক থাকলেও মনের ভেতরে এক গভীর কুয়াশা দানা বাঁধছিল। কিছু সাধারণ খবর, কিন্তু তার ভেতরে লুকিয়ে আছে এক ভয়াবহ ভবিষ্যতের পদধ্বনি। বিশটি সংস্কারধর্মী অধ্যাদেশ নাকি কার্যকারিতা হারাতে যাচ্ছে। এটি কেবল আইনি মারপ্যাঁচ নয়, এটি একটি রক্তাক্ত অভ্যুত্থানের পিঠে ছুরিকাঘাত। আমি যখন এই লেখাটি লিখছি, তখন আমার সামনে ভাসছে সেইসব তরুণদের মুখ, যারা বুক পেতে দিয়েছিল বুলেটের সামনে। তারা কি জানত, বিশ মাস না যেতেই তাদের স্বপ্নের ইমারতে ঘুণ ধরবে? তারা কি জানত, সংস্কারের নামে চলা নাটকটি শেষ পর্যন্ত এক নিষ্ঠুর প্রতারণায় পর্যবসিত হবে? জাতি হিসেবে আমাদের জন্ম বোধহয় বারবার প্রবঞ্চিত হওয়ার জন্যই। ইতিহাস সাক্ষী, আমরা লড়তে জানি কিন্তু ফসল ধরে রাখতে জানি না।
আওয়ামী শাসনামলের সেই অন্ধকার দিনগুলোর কথা ভাবুন। তখন আঠারো-উনিশটি গোয়েন্দা সংস্থা মানুষের শোবার ঘরেও আড়ি পাতার ক্ষমতা রাখত। ব্যক্তিগত গোপনীয়তা বলতে কিছুই ছিল না। অন্তর্বর্তী সরকার এসে সেই কালো আইন সংস্কার করেছিল। ক্ষমতা কমিয়ে মাত্র চারটি প্রতিষ্ঠানে আনা হয়েছিল এবং আদালতের অনুমতি বাধ্যতামূলক করা হয়েছিল। একেই বলে রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক রূপান্তর। কিন্তু বর্তমান সরকার সেই সংস্কার বাতিল করে আবারও সেই পুরনো আঠারো-উনিশটি সংস্থাকে অবাধে আড়ি পাতার ক্ষমতা ফিরিয়ে দিচ্ছে। এটি কি কেবল নিরাপত্তা রক্ষার তাগিদ? নাকি ভয়ের রাজত্ব কায়েম রাখার নতুন কৌশল? যখন কোনো সরকার নিজের নাগরিকদের প্রতিটি দীর্ঘশ্বাস শুনতে চায়, তখন বুঝতে হবে সেই সরকারের পায়ের নিচের মাটি আলগা হয়ে গেছে। মানুষের ব্যক্তিগত আলাপচারিতায় কান পাতা কোনো সুস্থ গণতন্ত্রের লক্ষণ হতে পারে না। এটি ফ্যাসিবাদী মানসিকতারই বহিঃপ্রকাশ।
সংস্কারের পথে এই যে পিছুটান, এটি একটি বৃহত্তর ষড়যন্ত্রের অংশ বলে আমি মনে করি। বিশটি অধ্যাদেশ যখন অর্থহীন হয়ে পড়ে, তখন রাষ্ট্র সংস্কারের পুরো প্রক্রিয়াটিই মুখ থুবড়ে পড়ে। গুম, খুন এবং মানবাধিকার হরণের যে সংস্কৃতি আমরা গত দেড় দশক ধরে দেখেছি, এই স্থবিরতা তারই পথ সুগম করছে। শেখ হাসিনার স্বৈরতান্ত্রিক ও ফ্যাসিবাদী শাসনের পুনরাবৃত্তি কি তবে আমাদের নিয়তি? মানুষ রাজপথে রক্ত দিয়েছিল ব্যবস্থা পরিবর্তনের জন্য, কেবল মুখ পরিবর্তনের জন্য নয়।
আজ যখন দেখি সংবিধান সংস্কার পরিষদ নিয়ে রাজনৈতিক টানাপোড়েন তুঙ্গে, তখন হতাশ হওয়া ছাড়া উপায় থাকে না। সরকারি দল সাফ জানিয়ে দিয়েছে তারা এই পরিষদ মানে না। জুলাই সনদকে তারা বলছে প্রতারণার দলিল। যদি সংস্কারের দাবিই নাকচ হয়ে যায়, তবে সেই রক্তাক্ত জুলাইয়ের মাহাত্ম্য কোথায় থাকল? ক্ষমতার অলিন্দে বসে কি মানুষ এতো দ্রুত জনম্যান্ডেট ভুলে যায়?
সবচেয়ে বেশি ব্যথিত হয়েছি গুম নিয়ে সরকারের উদাসীনতা দেখে। হাসিনার শাসনকালে বিএনপি ও জামায়াতের অসংখ্য নেতাকর্মী গুম হয়েছিলেন। সেই ক্ষত এখনো দগদগে। ইলিয়াস আলীর কথা কি আমরা ভুলে যেতে পারি? ডিজিএফআইয়ের সাবেক মহাপরিচালক জেনারেল মামুন খালেদ রিমান্ডে যে চাঞ্চল্যকর তথ্য দিয়েছেন, তা শুনে যে কোনো বিবেকবান মানুষের রক্ত হিম হয়ে যাওয়ার কথা। ধলেশ্বরী নদীতে পচাগলা লাশ হয়ে ভেসে যাওয়ার সেই গল্প কি কেবল গল্পই থেকে যাবে? এমন সময়ে গুম প্রতিকারের অধ্যাদেশ অনুমোদনে সরকারের এই অনীহা চরম দুর্ভাগ্যজনক। যুক্তি দেওয়া হচ্ছে জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থে আটককে গুম বলা যাবে না। আবার বলা হচ্ছে, সরকারের অনুমতি ছাড়া বাহিনীর বিরুদ্ধে তদন্ত করা যাবে না। এটি তো ঠিক সেই প্রবাদের মতো— ‘শেয়ালের অনুমতি নিয়ে মুরগির খোয়াড়ের দরজা লাগানো’। বিচারের বাণী যদি নিভৃতে কাঁদে, তবে রাজপথের সেই বিপ্লব কেবলই এক ব্যর্থ মহড়া হয়ে থাকবে।
লঙ্কায় যে যায় সে-ই রাবণ হয়। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী একবার একটি সভায় প্রশ্ন করেছিলেন, লঙ্কায় গেলেই রাবণ হতে হবে কেন? কথাটি খুব চমৎকার। কিন্তু কর্ম কি সেই কথার প্রতিধ্বনি করছে? সংস্কার নিয়ে এই যে দোটানা, এই যে তালবাহনা, তা কি সেই পুরনো রাবণ হওয়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে না? আমরা আশা করেছিলাম, শহীদ জিয়া ও বেগম জিয়ার উত্তরাধিকার বহনকারী নেতৃত্ব ক্ষমতার মোহে অন্ধ হবে না। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ব্যক্তিগতভাবে ভালো কিছু করার চেষ্টা করছেন বলে মনে হয়। কিন্তু তার চারপাশের বলয়টি কি তাকে সঠিক পথে চলতে দিচ্ছে? নাকি সরকারের ভেতরে অন্য কোনো প্যারালাল পাওয়ার বা সমান্তরাল শক্তির উত্থান ঘটেছে? সেই ছায়া শক্তির প্রতি কি খোদ সরকারপ্রধানের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ অনুমোদন আছে? যদি তাই হয়, তবে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ আবারও এক অন্ধকার গহ্বরে নিক্ষিপ্ত হতে যাচ্ছে।
আজকাল বিএনপির অনেক নেতাকর্মীর কণ্ঠে দম্ভ শুনি। তারা বলেন, আগামী পনের-বিশ বছরে নাকি দেশে কোনো গণঅভ্যুত্থান হবে না। কী ভয়াবহ ঔদ্ধত্য! এই সুর তো আমরা পনের বছর ধরে আওয়ামী লীগের মুখে শুনে এসেছি। ইতিহাস কি তবে কাউকে শিক্ষা দেয় না? আমি বিএনপিকে স্মরণ করিয়ে দিতে চাই, ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানের অর্জন রক্ষা করা যায়নি বলেই ১৯৭১ সংঘটিত হয়েছিল। ২০২৪ সালের অভ্যুত্থানের ফল যদি জোর করে কেড়ে নেওয়া হয়, তবে এ দেশে আবারও গণঅভ্যুত্থান হবে। জনতা যখন রাজপথে নামে, তখন দুই-তৃতীয়াংশ আসনের ক্ষমতা কোনো কাজে আসে না। বাংলাদেশের ইতিহাসে দুই-তৃতীয়াংশ আসন নিয়ে ক্ষমতায় বসা প্রতিটি সরকারই শেষ পর্যন্ত গণধিক্কার নিয়ে বিদায় নিয়েছে। ক্ষমতার জাদুকরী সংখ্যা চিরস্থায়ী নয়।
আমরা একটি নির্বাচিত সরকার চেয়েছিলাম। আমরা একটি শক্তিশালী সংসদ চেয়েছিলাম। কিন্তু তার চেয়েও বড় করে চেয়েছিলাম এমন এক রাষ্ট্রব্যবস্থা, যেখানে আর কোনো স্বৈরাচার জন্মাতে পারবে না। জুলাই বিপ্লবের স্পিরিট ছিল রাষ্ট্র সংস্কার। কিন্তু সেই সংস্কারের তরী আজ ক্ষমতার চোরাবালিতে আটকে গেছে। যে সংস্কার উদ্যোগগুলো নেওয়া হয়েছিল, তা বাতিল করা মানে এক পা এগিয়ে দুই পা পিছিয়ে যাওয়া। এটি কেবল রাজনৈতিক ব্যর্থতা নয়, এটি শহীদের রক্তের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা। গুম হয়ে যাওয়া সেই মানুষগুলোর পরিবারের দিকে তাকিয়ে দেখুন। তাদের চোখের পানির কি কোনো দাম নেই? বিচারের পথ রুদ্ধ করে জাতীয় নিরাপত্তার দোহাই দেওয়া কেবলই এক প্রকার নিষ্ঠুর তামাশা। রাষ্ট্রের নিরাপত্তা আর সরকারের নিরাপত্তা এক নয়। যখন সরকার নিজের অস্তিত্বকে রাষ্ট্রের নিরাপত্তার সাথে গুলিয়ে ফেলে, তখনই ফ্যাসিবাদ ডালপালা বিস্তার করে।
এখনো সময় আছে। পথ হারানো তরীকে সঠিক ঘাটে ভেড়ানোর সুযোগ ফুরিয়ে যায়নি। প্রধানমন্ত্রীকে বুঝতে হবে, তার বাবার লেগেসি কেবল ক্ষমতায় থাকা নয়, মানুষের হৃদয়ে থাকা। শহীদ জিয়ার রাজনীতি ছিল মানুষের আস্থা অর্জনের রাজনীতি। আজ সেই আস্থায় ফাটল ধরলে তার দায়ভার বর্তমান নেতৃত্বকেই নিতে হবে। ২০২৪ এর গণরায় কোনো ব্যক্তির বা দলের একক সম্পদ নয়, এটি একটি সামগ্রিক মুক্তিপত্র। একে তুচ্ছজ্ঞান করার দুঃসাহস যেন কেউ না দেখায়। সংস্কারের অধ্যাদেশগুলো কেবল কাগজ নয়, এগুলো আগামীর বাংলাদেশের রক্ষাকবচ। এগুলোকে অর্থহীন করার অর্থ হলো আবারও একনায়কতন্ত্রের রাজপথ প্রশস্ত করা।
বাংলাদেশ আর কোনো রাবণ দেখতে চায় না। মানুষ চায় তার হারানো অধিকার, তার বাকস্বাধীনতা এবং সামাজিক ন্যায়বিচার। এই দাবি কি খুব বেশি? যদি তাই হয়, তবে লঙ্কাকাণ্ডের পুনরাবৃত্তি কেবল সময়ের ব্যাপার মাত্র। ইতিহাস নির্দয়, সে কাউকেই ক্ষমা করে না। আমরা যেন সেই পুরনো খাদে আবার না পড়ি, এটাই আজ প্রার্থনা।




Leave a comment