✍️ ড. লোকমান খান
ভূমিকা: কেন এই আলোচনা এখন জরুরি
২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে বাংলাদেশে ঘটে যাওয়া ছাত্র-যুবকেন্দ্রিক গণঅভ্যুত্থান দক্ষিণ এশিয়ার রাজনৈতিক ইতিহাসে এক মাইলফলক। মাত্র কয়েক মাসের মধ্যেই নেপালে ঘটলো প্রায় অভিন্ন দৃশ্যপট। দুটি দেশের প্রেক্ষাপট ভিন্ন হলেও, শাসকশ্রেণির আচরণ, দমননীতি, এমনকি পতনের ধরন এতটাই মিল যে মনে হয় এক দেশের প্লেবুক আরেক দেশে হুবহু কপি-পেস্ট হয়েছে।
বাংলাদেশের অভিজ্ঞতা থেকে নেপাল কিছুই শিখল না। একই কায়দায় গণঅভ্যুত্থান দমনে শিশু ও ছাত্র হত্যার মধ্য দিয়ে ক্ষমতা আঁকড়ে ধরার চেষ্টা, এবং শেষে সামরিক হেলিকপ্টারে পালিয়ে যাওয়া—এ যেন ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি।
প্রশ্ন হলো, এর পর কী? দক্ষিণ এশিয়ায় কি আরও ঢেউ আছড়ে পড়তে চলেছে?
ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট: দুই দেশের সাদৃশ্য
বাংলাদেশ ও নেপাল—দুটি দেশেই গণতন্ত্রের কাঠামো থাকলেও বাস্তবে তা ছিল হাইব্রিড স্বৈরতন্ত্র।
বাংলাদেশে:
- পরিবারের হাতে ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ।
- দলীয়করণ ও দুর্নীতির চরম রূপ।
- অর্থনৈতিক বৈষম্য, দ্রব্যমূল্যের উল্লম্ফন।
- নিয়ন্ত্রিত নির্বাচন ও ভুয়া ভোটের সংস্কৃতি।
- তরুণ প্রজন্মের বঞ্চনা ও ক্ষোভ।
নেপালে:
- রাজতন্ত্র থেকে প্রজাতন্ত্রে রূপান্তরের পরও পরিবারভিত্তিক ক্ষমতার খেলা।
- দুর্নীতি সর্বব্যাপী।
- ক্ষমতাসীনদের প্রতি জনগণের আস্থাহীনতা।
- রাজনৈতিক অচলাবস্থা ও ভঙ্গুর অর্থনীতি।
এই দুই দেশের সাদৃশ্য শুধু অর্থনীতি বা রাজনীতিতে নয়; বরং শাসকশ্রেণির মানসিকতায়ও একই রকম আত্মকেন্দ্রিকতা ও জনবিচ্ছিন্নতা।
প্রজন্ম জি (Gen-Z) এবং তরুণদের উত্থান
দুই দেশেই গণঅভ্যুত্থানের প্রধান চালিকাশক্তি ছিল প্রজন্ম জি ও মিলেনিয়ালরা।
এরা আর কেবল সামাজিক মিডিয়ায় ক্ষোভ প্রকাশে সীমাবদ্ধ থাকেনি।
- ফেসবুক লাইভ, টিকটক, ইনস্টাগ্রাম রিল—এসব প্ল্যাটফর্মে দ্রুত সংগঠিত হয়েছে।
- মোবাইল ফোন হয়েছে তাদের অস্ত্র, হ্যাশট্যাগ হয়েছে যুদ্ধের পতাকা।
- বাংলাদেশে যেমন #নির্বাচনবাতিল এবং #শিক্ষার্থীর_রক্ত ভাইরাল হয়েছিল, নেপালে তেমনি #FreeNepal ট্রেন্ড করেছে।
এই প্রজন্ম কোনো পুরনো রাজনৈতিক দলের নেতৃত্বে বিশ্বাস করেনি। তারা নিজেরাই নেতৃত্ব তৈরি করেছে এবং মুহূর্তের মধ্যে তা ছড়িয়ে দিয়েছে শহর থেকে গ্রামে।
অভ্যুত্থানের ধাপসমূহ: একই কাহিনী দুই দেশে
১. সূচনা: ক্ষুদ্র প্রতিবাদ থেকে গণজাগরণ
বাংলাদেশে শুরু হয়েছিল বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস থেকে। নেপালেও একইভাবে ছোট ছোট ছাত্র আন্দোলন শহর জুড়ে ছড়িয়ে পড়ে।
প্রথমদিকে শাসকশ্রেণি এটিকে গুরুত্ব দেয়নি, বরং হালকা কটাক্ষ করেছিল।
২. গণসংগ্রামে রূপান্তর
কিছুদিনের মধ্যে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়।
- বাংলাদেশে: রাস্তায় লাখো মানুষের সমাবেশ।
- নেপালে: পাহাড়ি অঞ্চল থেকে রাজধানী কাঠমান্ডু পর্যন্ত অবরোধ ও মিছিল।
৩. দমননীতি: রক্তাক্ত অধ্যায়
দুই দেশেই সরকার একই কৌশল অবলম্বন করেছে।
- গুলি চালিয়ে শিশু ও ছাত্র হত্যা।
- কাঁদুনে গ্যাস, রাবার বুলেট, এবং গ্রেফতারি অভিযান।
- ইন্টারনেট বন্ধ করে খবর প্রচার বন্ধের চেষ্টা।
এগুলো কেবল ক্ষোভকে তীব্রতর করেছে। শান্তিপূর্ণ আন্দোলন মুহূর্তেই সহিংস রূপ নিয়েছে।
৪. পতন: সামরিক হেলিকপ্টারে পালানো
অবশেষে যখন রাজধানী অচল হয়ে যায়, তখন বাংলাদেশের মতো নেপালেও শাসকরা হেলিকপ্টারে পালিয়ে যায়।
এমনকি পুরো সরকার ও সংসদ সদস্যরাও দেশ ছেড়ে পালায়—এক অভূতপূর্ব ঘটনা।
তুলনামূলক বিশ্লেষণ: কপি-পেস্ট কৌশল
| বিষয় | বাংলাদেশ (২০২৪) | নেপাল (২০২৫) |
|---|---|---|
| রাজনৈতিক ব্যবস্থা | পরিবারতান্ত্রিক স্বৈরতন্ত্র | পরিবারতান্ত্রিক দুর্বল গণতন্ত্র |
| ট্রিগার ইভেন্ট | ভুয়া নির্বাচন | দুর্নীতির কেলেঙ্কারি ও অর্থনৈতিক সংকট |
| প্রযুক্তির ভূমিকা | ফেসবুক, টিকটক, ইউটিউব লাইভ | টিকটক, ইনস্টাগ্রাম, হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ |
| সরকারের প্রতিক্রিয়া | গুলি, ছাত্র-শিশু হত্যা | একই কৌশল—গুলিবর্ষণ ও গ্রেফতার |
| পতনের ধরণ | সামরিক হেলিকপ্টারে পালানো | সামরিক হেলিকপ্টারে পালানো |
বাহ্যিক প্রভাব: কে কার পাশে
কোনো অভ্যুত্থানই নিছক অভ্যন্তরীণ নয়।
ভারত:
- বাংলাদেশের ক্ষেত্রে প্রথমে নীরব, পরে কূটনৈতিক ভারসাম্য বজায় রাখতে সক্রিয়।
- নেপালের ক্ষেত্রে উদ্বিগ্ন, কারণ সীমান্ত অস্থিতিশীলতা ভারতের নিরাপত্তায় প্রভাব ফেলতে পারে।
চীন: - নেপালে বড় বিনিয়োগ থাকায় অস্থিরতা নিয়ে দুশ্চিন্তায়।
- বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও চীন চাইছিল স্থিতিশীলতা বজায় থাকুক।
পশ্চিমা শক্তি: - মানবাধিকার লঙ্ঘনের নিন্দা।
- অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার হুমকি।
মানবিক দিক: রক্তের গল্প
উভয় দেশেই গণঅভ্যুত্থান শুধু রাজনৈতিক নয়, মানবিক ট্র্যাজেডিও বটে।
- মায়ের কোলে গুলিবিদ্ধ সন্তানের লাশ—সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল ছবি।
- এক ছাত্রনেতার শেষ ফেসবুক পোস্ট: “আমাদের রক্ত বৃথা যাবে না।”
- হাসপাতালের বারান্দায় শোওয়া আহতদের কান্না।
এই সব দৃশ্য জনগণের মধ্যে ক্ষোভকে আরও গভীর করেছে এবং আন্তর্জাতিক মিডিয়ায় আন্দোলনকে শক্তিশালী করেছে।
শেখার সুযোগ হারানো: নেপালের ভুল
বাংলাদেশের গণঅভ্যুত্থান থেকে শিক্ষা নেওয়ার সুযোগ নেপালের ছিল।
বাংলাদেশে যে ভুলগুলো শাসকশ্রেণি করেছিল—
- রক্তপাত দিয়ে আন্দোলন দমন করার চেষ্টা।
- জনগণকে শত্রু মনে করা।
- সংবাদমাধ্যমকে দমন করা।
নেপালও হুবহু একই ভুল করেছে।
এটি প্রমাণ করে দক্ষিণ এশিয়ার শাসকশ্রেণি কেবল নিজেদের ক্ষমতা বাঁচাতেই ব্যস্ত, জনগণের আস্থা অর্জনের চেষ্টা করে না।
ভবিষ্যতের দিকনির্দেশনা: ঢেউ কি আরও ছড়াবে?
এখন বড় প্রশ্ন হলো, এটি কি কেবল দুই দেশের ঘটনা, নাকি দক্ষিণ এশিয়ার বৃহত্তর ঢেউয়ের সূচনা?
সম্ভাব্য দৃশ্যপট:
১. ভালো সম্ভাবনা:
- গণতান্ত্রিক সংস্কার, সুষ্ঠু নির্বাচন, এবং জনগণের আস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠা।
২. খারাপ সম্ভাবনা: - গৃহযুদ্ধ বা সামরিক শাসন।
- প্রতিবেশী দেশগুলোর হস্তক্ষেপ।
৩. অন্য দেশের সতর্কবার্তা: - পাকিস্তান,ভারতের সেভেন সিস্টারস সহ অন্যান্য দেশে একই ধরনের অসন্তোষ জমছে।
- অর্থনৈতিক সংকট এবং দুর্নীতি নতুন অস্থিরতার জন্ম দিতে পারে।
উপসংহার: ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি নাকি নতুন দিগন্ত
বাংলাদেশ থেকে নেপাল পর্যন্ত এই গণঅভ্যুত্থান দেখিয়ে দিল যে প্রজন্ম জি-এর নেতৃত্বে জনগণের শক্তি অবহেলা করা যায় না।
যে শাসকশ্রেণি রক্তপাত দিয়ে গণআন্দোলন দমন করতে চায়, তার পতন সময়ের ব্যাপার মাত্র।
দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর জন্য এটি সতর্কবার্তা:
“জনগণের কণ্ঠস্বরকে শোনা না হলে, সেই কণ্ঠস্বর শেষ পর্যন্ত শাসনকাঠামোকে ভেঙে ফেলতে পারে।”
এখন দুনিয়ার চোখ দক্ষিণ এশিয়ার দিকে।
ঢেউ কি থেমে যাবে, নাকি আরও শক্তিশালী হয়ে এগিয়ে যাবে—এটাই দেখার বিষয়।
১০ সেপ্টেম্বর ২০২৫






Leave a comment