✍️ ড. লোকমান খান
আপনি কি কখনো ভেবেছেন, কেন অনেক সময় আমরা মনেপ্রাণে কিছু চাইলেও তা অর্জন করতে পারি না?
পরীক্ষার আগে দৃঢ়ভাবে প্রতিজ্ঞা করলেন—“এবার প্রতিদিন নিয়মিত পড়াশোনা করবো।” কিন্তু কয়েকদিন পরই নিজেকে ইউটিউব বা ফেসবুকে সময় নষ্ট করতে দেখলেন।
অথবা মনে মনে প্রতিজ্ঞা করলেন—“এখন থেকে সবার সঙ্গে ভালো ব্যবহার করবো।” কিন্তু হঠাৎ কোনো ক্ষুদ্র কারণে রাগে চিৎকার করে ফেললেন।
এ যেন আমাদের ভেতরে আরেকজন অদৃশ্য মানুষ আছে, যে নীরবে আমাদের সিদ্ধান্তগুলোকে প্রভাবিত করছে। সেই অদৃশ্য শক্তিই হলো আমাদের অবচেতন মন। এটি আমাদের জীবনের গোপন কারিগর, যা নীরবে আমাদের চিন্তা, আচরণ এবং সিদ্ধান্তগুলোকে চালিত করে।
🌱 অবচেতন বিশ্বাস: শেকড়ের গল্প
একটি গাছের শেকড় যেমন মাটির নিচে লুকিয়ে থাকে, তেমনি আমাদের অবচেতন বিশ্বাসও মনের গভীরে লুকিয়ে থাকে। ছোটবেলা থেকে শোনা কথা, পরিবার ও সমাজ থেকে শেখা অভিজ্ঞতা, এবং জীবনের নানা ঘটনা মিলে এই শেকড় তৈরি হয়।
উদাহরণস্বরূপ, হয়তো ছোটবেলায় আপনার শিক্ষক বলেছিলেন,
- “তুমি অঙ্কে ভালো নও।”
বাবা রাগ করে বলেছিলেন, - “তর দ্বারা কিছু হবেনা।”
অথবা সমাজে শোনা যায়, - “সফল হতে হলে ভাগ্যের জোর দরকার।”
- “মেয়েরা বিজ্ঞান বা প্রযুক্তিতে তেমন ভালো নয়।”
এই বাক্যগুলো বারবার শুনতে শুনতে এগুলো আমাদের অবচেতন মনে গেঁথে যায়। পরে যখন বড় হয়ে আমরা সচেতনভাবে নতুন কিছু করতে চাই, তখনও সেই পুরনো বিশ্বাস নীরবে আমাদের সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করে। ফলে, আপনি যতই চেষ্টা করুন না কেন, ভেতরের সেই লুকানো বিশ্বাস আপনার অগ্রগতির ব্রেক চেপে ধরে রাখে।
এটিকে বলা যায় “মনের অদৃশ্য সফটওয়্যার”, যা মাঝে মাঝে ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে আমাদের জীবনে সমস্যা তৈরি করে।
🧠 দ্বৈত চিন্তাধারার মডেল
নোবেল পুরস্কারপ্রাপ্ত মনোবিজ্ঞানী ড্যানিয়েল কাহনেম্যান মানুষের মস্তিষ্কের কাজকে দুটি সিস্টেমে ব্যাখ্যা করেছেন। এটি অনেকটা গাড়ির দুই ধরনের গিয়ার সিস্টেমের মতো:
- সিস্টেম ১: দ্রুত, স্বয়ংক্রিয় এবং অবচেতন।
যেমন—গরম হাঁড়িতে হাত পড়লে মুহূর্তের মধ্যে হাত সরিয়ে নেওয়া। এখানে কোনো ভাবনা নেই, প্রতিক্রিয়া স্বয়ংক্রিয়। - সিস্টেম ২: ধীর, বিশ্লেষণধর্মী এবং সচেতন।
যেমন—একটি জটিল গাণিতিক সমস্যা সমাধান করা বা গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া।
আমাদের দৈনন্দিন জীবনের বেশিরভাগ কাজ সিস্টেম ১-এর মাধ্যমে হয়। তাই সচেতনভাবে পরিকল্পনা করলেও, যদি অবচেতন বিশ্বাস শক্তিশালী হয়, তবে সেটিই শেষ পর্যন্ত আমাদের আচরণ নিয়ন্ত্রণ করে।
🧬 নিউরোপ্লাস্টিসিটি: মস্তিষ্কের বিস্ময়কর ক্ষমতা
আপনি হয়তো ভাবছেন—“তাহলে কি আমি চিরকাল এই অবচেতন বিশ্বাসের বন্দি থেকে যাবো?”
ভালো খবর হলো, আমাদের মস্তিষ্কের একটি আশ্চর্যজনক ক্ষমতা আছে, যাকে নিউরোপ্লাস্টিসিটি (Neuroplasticity) বলা হয়।
এটি অনেকটা গ্রামের কাঁচা রাস্তা ধীরে ধীরে পাকা রাস্তায় পরিণত করার মতো। আপনি যতবার নতুনভাবে অনুশীলন করবেন, ততবার নতুন স্নায়বিক সংযোগ তৈরি হবে এবং পুরনো সংযোগ দুর্বল হয়ে যাবে। অর্থাৎ, আমরা চাইলে আমাদের অবচেতন মনকে নতুনভাবে গড়ে তুলতে পারি।
🔄 অবচেতন মনকে বদলানোর ৪ ধাপ
অবচেতন মনকে পরিবর্তন করার জন্য নিচের ধাপগুলো অনুসরণ করতে পারেন:
১. সচেতনতা (Awareness)
সবার আগে আপনাকে নিজের ভেতরের নেতিবাচক বিশ্বাসগুলো চিনতে হবে। নিজেকে প্রশ্ন করুন: “আমি কেন এই কাজটি করতে ভয় পাই?” বা “কেন আমি সবসময় নিজেকে ব্যর্থ মনে করি?” এই বিশ্বাসগুলো কোথা থেকে এসেছে, তা খুঁজে বের করা জরুরি।
২. মনোযোগ (Focused Attention)
এবার আপনি আপনার এই বিশ্বাসগুলো কীভাবে আপনার আচরণকে প্রভাবিত করছে, তা লক্ষ্য করুন। যেমন, যদি আপনি মনে করেন আপনি ভালো বক্তা নন, তাহলে আপনি হয়তো জনসমক্ষে কথা বলার সুযোগ এড়িয়ে যাবেন।
৩. সচেতন অনুশীলন (Deliberate Practice)
এখন সময় এসেছে পুরোনো আচরণ বদলে নতুন আচরণ শুরু করার। যদি আপনি বিশ্বাস করেন যে আপনি ভালো বক্তা নন, তাহলে ছোট ছোট গ্রুপে কথা বলা শুরু করুন। হয়তো প্রথমে আপনি ভয় পাবেন, কিন্তু বারবার অনুশীলনের মাধ্যমে আপনার মস্তিষ্ক নতুন সংযোগ তৈরি করবে। এটি অনেকটা সাইকেল চালানো শেখার মতো। প্রথমবার হয়তো পড়ে যাবেন, কিন্তু বারবার চেষ্টার পর আপনি সফল হবেন।
৪. দায়বদ্ধতা (Accountability)
নিজের প্রতি সৎ থাকুন এবং এই প্রক্রিয়ায় লেগে থাকুন। একটি ডায়েরি রাখুন যেখানে আপনি আপনার অগ্রগতি লিপিবদ্ধ করতে পারেন। এতে আপনি অনুপ্রাণিত থাকবেন।
🧘♀️ সহায়ক পদ্ধতি ও কৌশল
অবচেতন মনকে প্রভাবিত করার জন্য বিশ্বব্যাপী কয়েকটি কার্যকর পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়:
- অ্যাফারমেশন (Affirmations): প্রতিদিন ইতিবাচক বাক্য উচ্চারণ করা।
যেমন—“আমি পারবো, আমি সফল হবো।” - ভিজ্যুয়ালাইজেশন (Visualisation): চোখ বন্ধ করে নিজের কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জনের দৃশ্য কল্পনা করা এবং সেই অনুভূতিকে উপভোগ করা।
- জার্নালিং (Journaling): নিজের অনুভূতি ও চিন্তাভাবনা লিখে রাখা, যাতে ভেতরের জগৎকে বোঝা সহজ হয়।
- হিপনোসিস (Hypnosis): গভীর শিথিলতার মাধ্যমে অবচেতন মনে নতুন ইতিবাচক বার্তা পাঠানো।
🌼 কেস হিস্টরি ১.
শায়লার গল্প: অদৃশ্য দেয়াল
শায়লা একজন মেধাবী ছাত্রী। তার স্বপ্ন ছিল বিদেশের একটি স্বনামধন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে গবেষণা করার। কিন্তু যখনই সে আবেদনপত্র লিখতে বসত, তার হাত যেন থেমে যেত। যতই চেষ্টা করুক না কেন, সে মনে করত তার লেখা যথেষ্ট ভালো নয়। সে সবসময় নিজেকে বলত, “আমার মতো সাধারণ মেয়ের পক্ষে এত বড় স্বপ্ন দেখা মানায় না।” শায়লার এই ভাবনাগুলো এসেছিল তার ছোটবেলা থেকে। তার পরিবারে কেউ উচ্চশিক্ষিত ছিল না। প্রায়ই তাকে বলা হতো, “মেয়েরা এত বেশি পড়াশোনা করে কী করবে?” শায়লা সচেতনভাবে এই কথাগুলো মানত না, কিন্তু তার অবচেতন মনে এই বিশ্বাসটা গেঁথে গিয়েছিল। এটি তার স্বপ্নের পথে এক অদৃশ্য দেয়াল তৈরি করে রেখেছিল।
পরিবর্তনের শুরু
একদিন ইউটিউবে একটি ভিডিওতে তার চোখ আটকে গেল। “অবচেতন মন” নিয়ে একটি ভিডিও। সেখানে বলা হয়েছিল যে, নিজের ভেতরের বিশ্বাসকে চিহ্নিত করে প্রতিদিন নতুনভাবে অনুশীলন করতে হবে।। পুরো ভিডিও দেখার পর শায়লা বুঝতে পারল তার এই সমস্যার মূলে রয়েছে তার অবচেতন মনের গভীর বিশ্বাস। শায়লা নিজেই সেই বিশ্বাসগুলোকে চিহ্নিত করলো। শায়লা তার জার্নালে প্রতিদিন লিখত, “আমি আমার স্বপ্নের জন্য যথেষ্ট যোগ্য” এবং “আমার মেধা দিয়ে আমি যে কোনো উচ্চতায় পৌঁছাতে পারি।” প্রথমদিকে এই কথাগুলো তার কাছে মিথ্যা মনে হলেও, নিয়মিত অনুশীলনের পর সে এর প্রভাব অনুভব করতে শুরু করল। সে ছোট ছোট কাজগুলো সময়মতো শেষ করতে শুরু করল, যা আগে অসম্পূর্ণ রেখে দিত।
ফলাফল
ধীরে ধীরে শায়লার মনে আত্মবিশ্বাস ফিরে এল এবং সে তার আবেদনপত্রটি মনের মতো করে লিখল। শেষ পর্যন্ত শায়লা তার স্বপ্নের বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ পেল। এটি ছিল তার অবচেতন মনকে নতুন করে সাজানোর এক সফল উদাহরণ।
তার নিজের ভাষায়:
“আমি বুঝেছি, সমস্যা বাইরের ছিল না, সমস্যা ছিল ভেতরের। ভেতরের বিশ্বাস বদলালেই বাইরের বাস্তবতা বদলে যায়।”
🌱 কেস হিস্টরি ২.
আরিফের গল্প: ব্যর্থতার ভয়
আরিফ তার জীবনের প্রথম চাকরি ছেড়ে দিয়ে একটি ছোট ব্যবসা শুরু করেছিল। তার ব্যবসায়িক পরিকল্পনা ভালোই ছিল, এবং বাজারে তার পণ্যের চাহিদাও ছিল। কিন্তু যতই লাভ হতে শুরু করল, ততই তার মধ্যে এক অদ্ভুত ভয় কাজ করতে লাগল। সে বারবার ভাবত, “এই লাভ সাময়িক, আমি যেকোনো মুহূর্তে সব হারিয়ে ফেলব।” এই ভয়ের কারণে সে নতুন কোনো ঝুঁকি নিতে পারত না, এমনকি ব্যবসা বড় করার জন্য প্রয়োজনীয় বিনিয়োগও সে করতে পারছিল না। তার এই ভয়ের কারণ ছিল অতীতে ঘটে যাওয়া একটি ঘটনা। যখন সে কিশোর ছিল, তখন তার বাবার একটি ছোট ব্যবসা আর্থিক ক্ষতির শিকার হয়েছিল, যার ফলে তাদের পরিবারকে অনেক কষ্ট করতে হয়েছিল। আরিফের অবচেতন মন সেই স্মৃতিকে তার বর্তমানের সঙ্গে মিলিয়ে নিয়েছিল।
আত্ম-অন্বেষণের সময়
একদিন এক বন্ধুর পরামর্শে আরিফ একটি কর্মশালায় অংশ নেয় যেখানে অবচেতন মন নিয়ে আলোচনা হয়েছিল। সেখানে সে বুঝতে পারে, তার ভয় আসলে শৈশবের সেই কথাগুলোর ফল। সে উপলব্ধি করে—এগুলো তার বাবা-মায়ের অভিজ্ঞতা, তার নয়। আরিফ বুঝতে পারছিল যে তার এই ভয় তার ব্যবসার সাফল্যের পথে বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে। সে প্রতিদিন সকালে নিজেকে বলত, “আমি সফল হতে পারি” এবং “ক্ষতি সামলে নেওয়ার মতো ক্ষমতা আমার আছে।”
পদক্ষেপ
সে তার ব্যবসার সাফল্যের ছোট ছোট মাইলফলকগুলো লিখে রাখত এবং নিজেকে মনে করিয়ে দিত যে সে কতটা এগিয়েছে। আরিফ নিজেকে বোঝাল যে, তার বাবা যে ভুলগুলো করেছিলেন, সে সেগুলো থেকে শিখতে পারে, তার ভয়ের কারণে নিজের সম্ভাবনা নষ্ট করতে পারে না।
ফলাফল
ধীরে ধীরে তার মধ্যে ঝুঁকি নেওয়ার সাহস জন্মাল। সে নতুন পণ্য নিয়ে কাজ শুরু করল এবং তার ব্যবসার প্রসার ঘটাল। আরিফ তার অবচেতন মনের প্রোগ্রাম বদলে ফেলে শুধুমাত্র তার ব্যবসাকেই সফল করেনি, বরং তার জীবনেও নতুন করে আস্থা ফিরে পেয়েছে।
আরিফের মতে:
“আমি একসময় ভেবেছিলাম ব্যবসা মানেই ব্যর্থতা। কিন্তু এখন বুঝেছি, সেই ভয় ছিল আমার অবচেতন মনের গল্প, বাস্তবতার নয়।”
✨ শেষকথা
অবচেতন মন আমাদের জীবনের অদৃশ্য পরিচালক। যদি আমরা তাকে চিনতে না পারি, সে আমাদের জীবনকে নিজের মতো করে চালাবে। কিন্তু সচেতনভাবে যদি আমরা তাকে নতুনভাবে গড়ে তুলি, তবে আমাদের জীবনও নতুন রূপ পাবে।
এটি কোনো জাদু নয়—এটি বিজ্ঞান, অনুশীলন, এবং দৃঢ় ইচ্ছাশক্তির মিশ্রণ।






Leave a comment