✍️ ড. লোকমান খান
এআই বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে এখন অনেক আলোচনা, তর্ক-বিতর্ক এবং ভুল ধারণা সমান তালে চলছে। কেউ একে ভবিষ্যতের ত্রাণকর্তা মনে করছে, আবার কেউ মনে করছে এআই মানুষের চাকরি কেড়ে নেবে এবং সৃজনশীলতা ধ্বংস করে দেবে। কিন্তু আসলে এআই কী? একে নিয়ে এত ভয় বা উত্তেজনার কারণই বা কী?
প্রথমেই একটি বিষয় পরিষ্কার করা দরকার—এআই জাদুকরী কিছু নয়। অনেকের ধারণা, এআই মানুষের মতো সব কাজ করতে পারে। কিন্তু এখানে একটি বড় পার্থক্য রয়েছে। মানুষ চিন্তা করতে পারে, আবেগ অনুভব করতে পারে এবং নতুন কিছু সৃষ্টি করতে পারে। এআই এই তিনটির কোনোটিই করতে পারে না। এটি কেবল একটি ডিজিটাল টুল, একটি যন্ত্র, যা অ্যালগরিদম এবং তথ্যের প্যাটার্ন অনুসারে কাজ করে।
এআই ও সৃজনশীলতার ভুল ধারণা
আপনি হয়তো বলবেন—“এআই তো কবিতাও লিখে!”
হ্যাঁ, এআই আপনার অনুরোধে কবিতার মতো কিছু তৈরি করতে পারে। কিন্তু এটি আপনার কবিতা নয়, আপনার ভাবনা নয়। কারণ এআই নিজে কিছু ভাবছে না। এটি কেবল তার বিশাল তথ্যভান্ডার থেকে শেখা প্যাটার্ন ব্যবহার করছে। ধরুন, পৃথিবীর নামকরা সব কবির কবিতা এআইয়ের ডাটাবেসে আছে। আপনি যখন কবিতা লেখার অনুরোধ করেন, তখন সে শেখা প্যাটার্ন অনুযায়ী শব্দ সাজিয়ে একটি কবিতা তৈরি করে। কিন্তু এর ভেতরে কোনো মানবিক অনুভূতি নেই, নেই সৃষ্টির আনন্দ বা বেদনা—শুধু তথ্যের একটি নতুন বিন্যাস।
এআইকে বোঝার জন্য ক্যালকুলেটরের উদাহরণও দেওয়া যায়। ক্যালকুলেটর কখনো গণিতে ভুল করে না, কিন্তু সে জানে না গণিত আসলে কী। একইভাবে এআই কোনো আবেগ ছাড়াই কাজ করে, কেবল অ্যালগরিদম মেনে চলে।
এআই—একটি কার্যকর সহযোগী ও সময় বাঁচানোর উপায়
এআইকে কার্যকরভাবে ব্যবহার করার একটি উদাহরণ দিই। ধরুন, আপনি একটি গবেষণাভিত্তিক আর্টিকেল লিখতে চান। সবচেয়ে কষ্টসাধ্য কাজ হলো তথ্য সংগ্রহ।
আগে কী করতে হতো?
লাইব্রেরিতে গিয়ে বই, জার্নাল, সংবাদপত্র খুঁজে পড়া, নোট নেওয়া, রেফারেন্স লিখে রাখা। কোনো জার্নাল যদি ওই লাইব্রেরিতে না থাকতো, তবে লাইব্রেরিয়ান সেটি অন্য কোথাও থেকে সংগ্রহ করে দিতেন। এরপর গুগল সার্চ করে অতিরিক্ত তথ্য খুঁজতে হতো। এতে সপ্তাহ, কখনও মাস পার হয়ে যেত।
এখন এআই এসে সেই প্রক্রিয়াকে সহজ করে দিয়েছে।
আপনি এআইকে আপনার প্রয়োজনীয় বিষয়ের কথা জানালেই এটি মুহূর্তের মধ্যে অসংখ্য বই, জার্নাল এবং অন্যান্য উৎস থেকে প্রাসঙ্গিক তথ্য খুঁজে এনে সাজিয়ে দেবে। এরপর আপনাকে শুধু পড়তে হবে, যাচাই করতে হবে এবং নিজের ভাষায় লিখতে হবে। ফলে দুই মাসের কাজ হয়তো দুই দিনে শেষ করা সম্ভব।
তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় মনে রাখতে হবে। এআই মাঝে মাঝে ভুল তথ্য দিতে পারে, যাকে “এআই হ্যালুসিনেশন” বলা হয়। উদাহরণস্বরূপ, আপনি যদি এআইকে জিজ্ঞেস করেন—“পদ্মা সেতু কবে উদ্বোধন হয়েছে,” এটি ভুল তারিখ জানিয়ে দিতে পারে। তাই অন্ধভাবে এআই-এর তথ্যের ওপর ভরসা না করে অবশ্যই ম্যানুয়ালি যাচাই করা জরুরি।
এআইয়ের অন্ধকার দিক
যেকোনো শক্তিশালী টুলের মতোই এআই-এরও ভালো ও খারাপ দিক আছে। ভালো মানুষের হাতে এটি চিকিৎসা, গবেষণা, শিক্ষা ইত্যাদিতে বিশাল অবদান রাখতে পারে। কিন্তু খারাপ মানুষের হাতে পড়লে এআই বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে।
এআই-এর অপব্যবহারের কিছু উদাহরণ হলো:
- ভুয়া ছবি বা ভিডিও বানিয়ে গুজব ছড়ানো।
- পুরনো ছবি ব্যবহার করে বর্তমান ঘটনার নামে প্রচার চালানো।
- প্রোপাগান্ডা তৈরি করে জনমনে বিভ্রান্তি ছড়ানো।
- সাইবার যুদ্ধ বা নির্বাচনে প্রভাব বিস্তার করা।
এসব কার্যক্রম শুধু আমাদের দেশেই নয়, সারা বিশ্বেই বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাই এআই ব্যবহারের ক্ষেত্রে কেবল দক্ষতা নয়, নৈতিকতাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
এআইকে এড়ানো যাবে না
এআই এখন আমাদের জীবনের অংশ। এটি আগামী দিনে আরও গভীরভাবে জড়িয়ে যাবে। তাই একে এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব নয়।
আমাদের করণীয় হলো—
- এআইকে বোঝা এবং এর কাজের ধরন শেখা।
- সঠিকভাবে ব্যবহার করে নিজের কাজের গুণগত মান ও গতি বৃদ্ধি করা।
- এর অপব্যবহার সম্পর্কে সচেতন থাকা এবং প্রতিরোধ করা।
মনে রাখতে হবে, এআই ভালো বা মন্দ নয়—এটি কেবল একটি যন্ত্র। এর সঠিক বা ভুল ব্যবহার নির্ভর করে আমাদের ইচ্ছার উপর।
শেষ কথা
এআই আমাদের প্রতিযোগী নয়, আমাদের সহযোগী। ভয় পাওয়ার কিছু নেই, তবে অন্ধভাবে বিশ্বাস করারও সুযোগ নেই। দক্ষতা এবং নৈতিকতার সমন্বয়েই এআই আমাদের জন্য আশীর্বাদ হয়ে উঠতে পারে। তাই আসুন, আমরা এআইকে সঠিকভাবে কাজে লাগাতে শিখি এবং সমাজের কল্যাণে এর শক্তিকে ব্যবহার করি।
৩ সেপ্টেম্বর ২০২৫






Leave a comment