বিশ্লেষক ও লেখক: ড. লোকমান খান

সম্প্রতি মধ্যপ্রাচ্যে ইসরায়েল এবং ইরানের মধ্যে সামরিক সংঘাতের যে নতুন অধ্যায় শুরু হয়েছে, তা কেবল আঞ্চলিক স্থিতিশীলতাই নয়, বিশ্ব অর্থনীতিকেও এক গভীর সংকটের মুখে ঠেলে দিয়েছে। গত ১৩ই জুন থেকে শুরু হওয়া ক্ষেপণাস্ত্র ও বিমান হামলার পাল্টাপাল্টিতে এই অঞ্চলে এক নতুন যুদ্ধের সূচনা হয়েছে। প্রশ্ন উঠছে, ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী কি ইচ্ছাকৃতভাবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ডকে এই সংঘাতে টেনে আনছেন? এই সংঘাত কি বৃহত্তর মধ্যপ্রাচ্যে ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা আছে? এবং দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের বৈশ্বিক অর্থনীতি, বিশেষ করে তেলের দামের উপর কী প্রভাব পড়বে?

আমার ব্যক্তিগত অভিমত হলো, ইসরায়েল বিনা প্ররোচনায় ইরানের ওপর হামলা চালিয়ে আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করেছে। ইসরায়েল বা অন্য কোনো সংস্থা ইরানের পারমাণবিক অস্ত্র থাকার বিষয়ে কোনো বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণ হাজির করতে পারেনি। যদিও আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা (IAEA) ইরানের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কর্মসূচির বিস্তার নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে, তারা সরাসরি পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির কোনো প্রমাণ দেয়নি। মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলোও ২০২৩ এবং ২০২৪ সালের প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে যে, ইরান পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় কার্যক্রম পরিচালনা করছে না। উপরন্তু, ইরান সাম্প্রতিক মাসগুলোতে ইসরায়েলের ভেতরে বা বাইরে কোনো ইসরায়েলি স্বার্থে সরাসরি আক্রমণ চালায়নি। এই পরিস্থিতিতে ইসরায়েলের একতরফা হামলা কেবল অস্থিতিশীলতা বৃদ্ধি করছে এবং আন্তর্জাতিক আইনের মৌলিক নীতিগুলিকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে।

১৩ই জুন থেকে চলমান ক্ষেপণাস্ত্র ও বিমান যুদ্ধ:

গত ১৩ই জুন থেকে ইসরায়েল এবং ইরানের মধ্যে এক ভয়াবহ ক্ষেপণাস্ত্র ও বিমান যুদ্ধ চলছে। ইসরায়েল দাবি করছে, তারা ইরানের পারমাণবিক স্থাপনা এবং সামরিক নেতাদের লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে, যার প্রতিক্রিয়ায় ইরান ইসরায়েলের শহরগুলিতে ব্যাপক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালায়। ইসরায়েলের তেল আবিব, হাইফা, গ্যালিলি, বাত ইয়াম এবং অন্যান্য অঞ্চলে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হেনেছে, যার ফলে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি এবং বেসামরিক হতাহতের ঘটনা ঘটেছে। ইরানের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ইসরায়েলি হামলায় তাদের ২২৪ জনেরও বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন, যাদের মধ্যে শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তা এবং পরমাণু বিজ্ঞানীরাও রয়েছেন। ইসরায়েলি গণমাধ্যমও তাদের হামলায় ১৩ জন নিহত হওয়ার খবর দিয়েছে। এই পাল্টাপাল্টি হামলা আঞ্চলিক পরিস্থিতিকে আরও বিস্ফোরক করে তুলেছে এবং এটি একটি পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। বিশেষ করে, ইসরায়েলের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে সরাসরি সম্প্রচারের সময় হামলার ঘটনা, এবং ইরানের পারমাণবিক বিজ্ঞানী ও সামরিক কর্মকর্তাদের লক্ষ্য করে আক্রমণ, পরিস্থিতিকে আরও জটিল ও বিপজ্জনক করে তুলেছে।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা এবং সংঘাতের বিস্তার:

ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু এবং মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ডের মধ্যে সম্পর্ক দীর্ঘদিনের। নেতানিয়াহু কি এই সংঘাতকে ব্যক্তিগত সম্পর্কের সূত্রে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ডের উপর চাপিয়ে দিচ্ছেন? ডোনাল্ড প্রশাসন যদি ইসরায়েলের এই পদক্ষেপকে সমর্থন করে, তবে তা এই সংঘাতকে আরও জটিল করে তুলবে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যপ্রাচ্য নীতি ঐতিহ্যগতভাবে ইসরায়েলের নিরাপত্তা স্বার্থের সাথে নিবিড়ভাবে জড়িত। যদি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েলের সামরিক অভিযানকে সমর্থন করে, তবে তা অনিবার্যভাবে সংঘাতে সৌদি আরব এবং অন্যান্য উপসাগরীয় দেশগুলোকে টেনে আনতে পারে, যা বৃহত্তর মধ্যপ্রাচ্যে একটি আঞ্চলিক যুদ্ধের প্রেক্ষাপট তৈরি করবে। ইয়েমেন, সিরিয়া এবং লেবাননে চলমান সংঘাতের রেশ ধরে এই নতুন যুদ্ধ একটি ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। এর ফলে মধ্যপ্রাচ্যের মানচিত্র বদলে যেতে পারে এবং লাখ লাখ মানুষ উদ্বাস্তু হতে পারে। এই সংঘাত যদি সৌদি আরব এবং ইরানের মধ্যে সরাসরি সংঘর্ষে রূপ নেয়, তবে তা সমগ্র মুসলিম বিশ্বের জন্য এক চরম অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টি করবে।

বিশ্ব অর্থনীতিতে দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের প্রভাব:

মধ্যপ্রাচ্য বিশ্বের বৃহত্তম তেল উৎপাদনকারী অঞ্চল। এই অঞ্চলে একটি দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত বিশ্ব অর্থনীতিতে ভয়াবহ প্রভাব ফেলবে, যার প্রধান শিকার হবে তেলের বাজার। গত ১৩ই জুন হামলার পর বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম একঝটকায় ১৩ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে গেছে। যদি যুদ্ধ পূর্ণমাত্রায় রূপ নেয় এবং তেল সরবরাহ ব্যাহত হয়, তবে তেলের দাম আরও আকাশচুম্বী হবে, যা পরিবহন খরচ বৃদ্ধি, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি এবং মুদ্রাস্ফীতির কারণ হবে। এর ফলস্বরূপ বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক মন্দা দেখা দিতে পারে। উন্নয়নশীল দেশগুলো সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে, কারণ তারা জ্বালানি আমদানির উপর অধিক নির্ভরশীল। সরবরাহ শৃঙ্খল ব্যাহত হবে, বিনিয়োগ কমে যাবে এবং বৈশ্বিক বাণিজ্য মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। বিশ্ব অর্থনীতি এমনিতেই কোভিড-১৯ মহামারী এবং ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাবে বিপর্যস্ত, এর উপর এই নতুন সংঘাত এক অপ্রত্যাশিত চাপ সৃষ্টি করবে। স্বর্ণের মতো নিরাপদ আশ্রয়স্থলের দিকে বিনিয়োগকারীদের ঝোঁক বাড়বে, যা অন্যান্য অর্থনৈতিক খাতে অস্থিরতা তৈরি করবে।

রাশিয়া ও চীনের ভূমিকা:

এই সংঘাতে রাশিয়া ও চীনের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। রাশিয়া এবং চীন উভয়েই ইরানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রাখে এবং উভয়েই পারমাণবিক চুক্তি পুনরুজ্জীবিত করার পক্ষে। তারা এই অঞ্চলে মার্কিন প্রভাবের বিস্তারকে সন্দেহের চোখে দেখে। যদিও রাশিয়া ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে সামরিকভাবে ইরানকে সরাসরি সমর্থন করার মতো অবস্থানে নেই, তবুও তারা রাজনৈতিক ও কূটনৈতিকভাবে ইরানের পাশে থাকবে। রাশিয়ার সাথে ইরানের সাম্প্রতিক কৌশলগত অংশীদারিত্ব চুক্তি একটি সামরিক জোট না হলেও, এটি উভয় দেশকে অভিন্ন হুমকি মোকাবেলায় সহায়তা করবে। অন্যদিকে, চীন ইরানের তেলের অন্যতম বৃহত্তম ক্রেতা। যদি সংঘাত তীব্র হয়, তবে এই দুটি দেশ ইরানের পক্ষে আরও জোরালো অবস্থান নিতে পারে, যা ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলবে। রাশিয়া এবং চীন উভয়ই জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্য, এবং তারা তাদের ভেটো ক্ষমতা ব্যবহার করে ইসরায়েল বা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে কোনো প্রস্তাব আটকাতে পারে। তাদের কৌশলগত স্বার্থ এই সংঘাতে একটি ভারসাম্য বজায় রাখার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। এসসিও (সাংহাই কোঅপারেশন অর্গানাইজেশন) এর সাম্প্রতিক বিবৃতিতে ইসরায়েলের হামলার নিন্দা জানানো এবং ইরান-ইসরায়েল উত্তেজনার বিষয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ, রাশিয়া ও চীনের অবস্থানকে স্পষ্ট করে তোলে।

আন্তর্জাতিক আইনের প্রতি অবজ্ঞা এবং বিশ্ব শান্তির হুমকি:

ইসরায়েলের এই হামলার ঘটনা আন্তর্জাতিক আইনের প্রতি এক চরম অবজ্ঞা প্রদর্শন করে। জাতিসংঘের সনদ অনুযায়ী, কোনো রাষ্ট্র অন্য কোনো রাষ্ট্রের ভূখণ্ডের উপর শক্তি প্রয়োগ করতে পারে না, যদি না আত্মরক্ষার প্রয়োজন হয়। এক্ষেত্রে ইরানের পক্ষ থেকে কোনো সরাসরি আক্রমণের প্রমাণ না থাকায়, ইসরায়েলের এই পদক্ষেপকে আগ্রাসন হিসেবে দেখা হচ্ছে। আন্তর্জাতিক বিচার আদালত (ICJ) এবং মানবাধিকার সংস্থাগুলোও ইসরায়েলের এই হামলাকে আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন হিসেবে আখ্যায়িত করেছে। এই ধরনের একতরফা সামরিক পদক্ষেপ বিশ্ব শান্তি ও নিরাপত্তাকে মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত করে এবং কূটনৈতিক সমাধানের পথকে রুদ্ধ করে দেয়। ইসরায়েলের এই পদক্ষেপের ফলে মধ্যপ্রাচ্যে অস্ত্র প্রতিযোগিতা বাড়তে পারে এবং আঞ্চলিক দেশগুলির মধ্যে অবিশ্বাস ও শত্রুতা আরও বৃদ্ধি পেতে পারে।

উপসংহার:

ইসরায়েল-ইরান সংঘাত কেবল দুটি দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এটি সমগ্র মধ্যপ্রাচ্য এবং বিশ্ব অর্থনীতির জন্য এক গুরুতর বিপদ। বিনা প্ররোচনায় আক্রমণ এবং আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন কেবল উত্তেজনা বাড়ায় এবং সমাধানের পথ বন্ধ করে দেয়। দ্রুত কূটনৈতিক সমাধান খুঁজে বের করা এবং সমস্ত পক্ষের সংযম প্রদর্শন করা অত্যন্ত জরুরি। জাতিসংঘ, ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং অন্যান্য আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোকে অবিলম্বে এই সংঘাত নিরসনে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। অন্যথায়, এই সংঘাত কেবল মধ্যপ্রাচ্য নয়, সমগ্র বিশ্বের স্থিতিশীলতা এবং অর্থনীতিকে এক ভয়াবহ অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দেবে। মধ্যপ্রাচ্যে যদি একটি পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধ শুরু হয়, তবে এর মানবিক ও অর্থনৈতিক পরিণতি হবে অবর্ণনীয়, যার রেশ দীর্ঘকাল ধরে বিশ্বকে প্রভাবিত করবে।

১৬ জুন ২০২৫


Discover more from LK INNOVATE

Subscribe to get the latest posts sent to your email.

Leave a comment

Trending

Discover more from LK INNOVATE

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading