ছোট গল্প
রহিম চৌধুরী তার ঢাকার ছোট্ট ফ্ল্যাটের জানালা দিয়ে নিচের রাস্তায় যানবাহন ও পথচারীদের চঞ্চলতা দেখছিলেন। হাতে ধুমায়িত কফি। রাস্তায় বাচ্চা মেয়েটি বেলি ফুলের মালা বেঁচার জন্য কসরত করে যাচ্ছে। হাতের মালাগুলো বেঁচতে পারলেই আজ রাতে বাবা-মায়ের সাথে পেট পুরে খেতে পারবে। হতাশা ছুয়ে যায় তার মন। যে শহরে রুফটপ সুইমিংপুল আছে সেই শহরে একটা বাচ্চা মেয়ে একবেলা খাওয়ার জন্য সারাদিন রোদে পুড়ে বেলিফুলের মালা বেঁচে। তার বাবা নাজিম চৌধুরী কি এজন্য যুদ্ধ করেছিলেন একাত্তুরে?
‘দৈনিক সুর্য’ পত্রিকার তদন্তকারী সাংবাদিক হিসেবে স্থানীয় রাজনীতিবিদ আমিন চাকলাদারের দুর্নীতি নিয়ে অনুসন্ধানের কাজ করছিলেন। রহিমের গবেষণায় অসৎ রিয়েল এস্টেট লেনদেন এবং জনগণের অর্থের অপব্যবহারের প্রমাণ উঠে এসেছে। তিনি এমন একটি স্টোরি লিখছেন যা সমাজকে হতবাক করে দেবে।
লেখাটি তাঁর সম্পাদকের কাছে জমা দেওয়ার পর রহিম নিকটস্থ চায়ের দোকানে তাঁর বন্ধু রাজুর সাথে দেখা করতে গেলেন। তিনি রাজুকে কালকের ফ্রন্ট পেজে যাওয়া বিস্ফোরক গল্পটি বললেন।
“দোস্ত, কালকের পত্রিকাটা দেখলে তোর চোখ কপালে উঠে যাবে। আমি আমিন চাকলাদারের বিষয়ে এমন কিছু প্রমাণ পেয়েছি যা তুই কল্পনাও করতে পারবি না!”
“আবার সেই দুর্নীতি?”
রাজু হেসে উড়িয়ে দিতে চাইলো।
“আমরা যা ভাবছিলাম তার চেয়েও খারাপ, দোস্ত। কালো টাকা পাচার, ঘুষ, জমি জালিয়াতি। সব প্রমাণের কাগজপত্রই আমার কাছে আছে।”
“অসাধারণ! তোর এই রিপোর্টে একটা ঝাঁকুনি দেবে সমাজকে। কিন্তু সাবধান থাকিস, ওরা বিপজ্জনক লোক।”
রাজু খুব সিরিয়াসলি নিচ্ছে না।
“চিন্তা করিস না, আমি সাবধান থাকবো। এই গল্পটা মানুষদের জানাতেই হবে।”
অফিসের কাজ শেষ করে রহিম বাড়ি ফিরছিলেন। বেশ রাত হয়ে গেছে। নির্জন রাস্তা। হঠাৎ টিন্টেট জানালার কালো রঙের একটি এসইউভি গাড়ি তার পাশে এসে থামল। শক্তিশালী হাত তাকে গাড়ির ভিতরে টেনে নিয়ে গেল। কালো কাপড় দিয়ে তার চোখ বাঁধা হল। শক্ত দড়ি দিয়ে হাত বাঁধা হল।
ঘন্টা দেড়েক চলার পর শহর থেকে দুরের এক বাগান বাড়িতে পৌঁছল গাড়ি। তার চোখের বাঁধন খুলে দেয়া হলো। আমিন চাকলাদার দামী সোফায় বসে আছেন। টি টেবিলে রংগীন পানীয়। চোখ নেশায় লাল।
দুর্নীতিবাজ রাজনীতিবিদ হেসে রহিমকে বললেন,
“কি খবর বিরক্তিকর সাংবাদিক রহিম চৌধুরী! আপনার মিথ্যা গল্প আমাকে বেশ সমস্যায় ফেলেছে!”
“মিথ্যা নয়। আমার রিপোর্টে সবকিছুর প্রমাণ আছে। আপনি আর আপনার অপরাধ ঢেকে রাখতে পারবেন না।”
“আমি সেটা দেখব! আমি আপনাকে সরে দাঁড়ানোর জন্য সতর্ক করেছিলাম, কিন্তু আপনি শোনেননি। এখন আপনার বোকামির মূল্য চোকাতে হবে!”
“আমি ভয় পাই না, চাকলাদার। সত্যিটা শেষ পর্যন্ত বের হয়ে আসবে।”
“আপনি সেই গল্প বলার জন্য বেঁচে থাকবেন না। আজই আপনার শেষ দিন। কেউ আপনার নামও মনে রাখবে না।”
পরবর্তী কয়েক ঘণ্টা রহিমকে নির্দয়ভাবে পিটিয়ে ও নির্যাতন করে রক্তাক্ত করা হলো। আমিন চাকলাদারের দুষ্কৃতকারীরা তাদের মুষ্টি, লাঠি এবং জ্বলন্ত সিগারেট ব্যবহার করে অসহায় সাংবাদিককে যন্ত্রণা দিয়ে আমোদ পাচ্ছিল।
“শুনুন, সাংবাদিক সাহেব, এবার জানে মারলামনা। আগামী কাল পত্রিকায় বিবৃতি দিয়ে বলবেন, স্টোরির সব বানোয়াট। তারপর পত্রিকা থেকে রিজাইন করবেন। তা না হলে আপনি তো মরবেনই, সাথে আপনার পরিবারও।”
তারপর হাঁক দিয়ে দলবলকে বললেন, “যেখান থেকে তুলে এনেছিলি সেখানে ফেলে দিয়ে আয়।” তার পর আবার পানীয়ের গ্লাস হাতে নিলেন।
রহিমকে চোখ বাধা অবস্থায় রাস্তায় ফেলে দেওয়া হয়। সে ঘরে ফিরে আসে রক্তাক্ত অবস্থায়। কষ্টের সাথে তার অভিজ্ঞতার একটি বিবরণ মোবাইল ফোনে টাইপ করে এবং ‘দৈনিক সুর্য’ পত্রিকায় ইমেইল করে দেয়। পরের সকালে, গল্পটি ফ্রন্ট পেজে ছাপা হয়। ঢাকা জুড়ে ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। কর্মকর্তারা তদন্তের ঘোষণা দেন এবং আমিন চাকলাদার শহর থেকে পালিয়ে যায়।
লম্বা ঘুম থেকে উঠে রহিম নিজেকে একটি প্রাইভেট ক্লিনিকে আবিস্কার করলেন।
“মিঃ চৌধুরী, কেমন বোধ করছেন? মাথার ব্যথা কি কমেছে?” ডাক্তার বললেন।
“আমি ক্লিনিকে কেন?”
“গতকাল আপনি মাথার ব্যথায় জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছিলেন। আপনার স্ত্রী ক্লিনিকে নিয়ে আসেন।”
“আমি তো কিছুই বুঝতে পারছি না।”
“আপনাকে কড়া ঘুমের ইন্জেকশন দেয়া হয়েছিল। কিছু টেস্টের ব্যবস্থা করা হয়েছিল। সেগুলোর ফলাফল এসেছে। আমি আশঙ্কা করছি, আপনার ফ্রন্টাল লোবে একটি বড় টিউমার আছে,” ডাক্তার জানালেন।
“কি বলছেন এসব?”
“আমি দুঃখিত, মিঃ চৌধুরী।”
“পত্রিকা অফিস থেকে কেই এসেছিল? গতকাল গুরুত্বপূর্ণ একটা স্টোরি ছাপানোর কথা।”
“কেউ আসেনি। কোন স্টোরিও ছাপা হয়নি। টিউমারটি সম্ভবত হ্যালুসিনেশনের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। আপনি যা যা কিছু বর্ণনা করেছেন – সহিংসতা, অপহরণ – এগুলি সবই আপনার কল্পনা।”
“অসম্ভব! আঘাত, ব্যথা – সবকিছুই এতটা সত্যি বলে মনে হয়েছিল। আপনি নিশ্চিত?”
“মন আপনাকে ধোঁকা দিয়েছে। আপনার টিউমারটি একটি বিস্তৃত মিথ্যা বাস্তবতা তৈরি করেছে।”
“আমি কী বিশ্বাস করবো বুঝতে পারছিনা। আমি কি সত্যিই এতটা মিথ্যা কাহিনী তৈরি করেছি?”
“আপনার আগ্রহ অনুকরণীয়, কিন্তু এখন আপনার স্বাস্থ্যের দিকে মনোযোগ দেয়া উচিত। তারপর আপনি সত্যের অনুসন্ধানে ফিরে যেতে পারবেন।”
ডাক্তারের কথাগুলি বাতাসে ভাসছিল, রহিমের ভগ্ন মনে প্রতিধ্বনিত হচ্ছিল। সবই ছিল কেবল কল্পনা? অসুস্থ মস্তিষ্কের সৃষ্টি? স্মৃতিগুলো এতটাই সত্যি মনে হয়েছিল, ভয়, ব্যথা, বিশ্বাসঘাতকতার জ্বালা। সত্যিই সে ভয়াবহ সত্যের সন্ধান পেয়েছিল কি? তার নিজের শরীরই তাকে অসহনীয় বাস্তবতা থেকে রক্ষা করতে একটি কল্পনার ঢাল তৈরি করেছিল?
রহিম বাইরের ঝলমল করতে থাকা শহরের দিকে তাকালেন। প্রতিটি ঝলকানিই তার কাছে মিথ্যাচারের মতো মনে হচ্ছে। আমিন চাকলাদার কি সত্যিই চলে গেছে, নাকি এটা কোন জটিল কৌশল? সংবাদপত্রের প্রতিবেদন, জনগণের ক্ষোভ, তদন্ত – সবই কি তার অকার্যকর মস্তিষ্কের তৈরি করা বিস্তৃত স্বপ্ন?
তার ভিতরে প্রতিবাদের একটি ঝলক জ্বলে উঠল। সে আমিন চাকলাদারের সত্যিটা না জানতে পারে, কিন্তু সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে জ্বলতে থাকা মিথ্যার আগুনকে, বিচারের তৃষ্ণাকে উপেক্ষা করতে পারেনা।
রহিমের দৃঢ় দৃষ্টি ডাক্তারের দিকে ফিরে এলো। “আমার চিকিৎসা শুরু করুন,” কর্কশ গলায় বলল। তার কণ্ঠস্বর দৃঢ়। “আমি হয়তো জানি না সত্য আসলে কি। কিন্তু আমি সত্যের জন্য লড়াই করে যাবো।”
অন্যায়ের কলঙ্কে দূষিত এ শহরে, কখনও কখনও বিচার সঠিকের পক্ষে যায় না। বিজয় দূরের বলে মনে হলেও ন্যায়ের জন্য লড়াই চালিয়ে যাওয়ার বিকল্প নেই। কথাগুলো ভাবতে ভাবতে রহিম ঘুমিয়ে পড়লো।
১৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৪
ডিসক্লেইমারঃ এটি কাল্পনিক রচনা। এতে ব্যবহৃত নাম, চরিত্র, স্থান এবং ঘটনা লেখকের কল্পনাপ্রসূত। বাস্তব ব্যক্তি, জীবিত অথবা মৃত, ঘটনা বা স্থানের সাথে এর কোনও সাদৃশ্য সম্পূর্ণরূপে ঘটনাক্রমে।






Leave a comment