ভূমিকা
আমি নারী ও পুরুষের সমান অধিকারে বিশ্বাস করি। নারীদের অধিকার নিয়ে কথা বলি। সেই কারণে অনেকে আমাকে নারীবাদীর অপবাদ দিতে ছাড়ে না। আজকের নিবন্ধটি পুরুষদের অধীকার নিয়ে। আমাকে আবার পুরুষবাদীর খেতাব দিয়ে বসবেন না যেন।
একটি মিথ দিয়ে নিবন্ধটি শুরু করছি।
শ্রুতি (Myth): পুরুষরা পারিবারিক সহিংসতার শিকার হতে পারে না।
বাস্তব (Reality): পুরুষরা পারিবারিক সহিংসতার শিকার হতে পারে, এবং হয়।
পারিবারিক সহিংসতা একটি জটিল ও গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক সমস্যা, যা জাতিগোষ্ঠীয় পরিচয়, অর্থনৈতিক অবস্থা বা লিঙ্গ নির্বিশেষে সব ধরণের মানুষ্যকেই প্রভাবিত করে। সাধারণত দেখা যায়, পারিবারিক সহিংসতার ঘটনায় পুরুষকে নির্যাতকারী এবং নারীকে নির্যাতিত হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। কিন্তু, এই বর্ণনাটি পারিবারিক সহিংসতার বাস্তব চিত্রের একটি অতিসরলীকরণ মাত্র। সত্যিকারের বিষয় হলো, পারিবারিক নির্যাতন এমন একটি ব্যাপক সমস্যা যেটি সমাজে অবস্থান নির্বিশেষে যে কাউকেই প্রভাবিত করতে পারে। শুধু মারধর নয়, মানসিক, আর্থিক নির্যাতন সহ বিভিন্ন রূপে এটি প্রকাশ পায়।
পারিবারিক সহিংসতার গতিধারা জটিল। এতে ক্ষমতা, নিয়ন্ত্রণ ও ভীতি জড়িত থাকে। এর প্রভাবও গভীর, শুধু মুহূর্তের ক্ষতিই করে না বরং দীর্ঘস্থায়ী মানসিক ও সামাজিক পরিণতি ঘটায়। পারিবারিক সহিংসতা রোধ ও মোকাবিলায় এর পূর্ণ বিস্তার স্বীকার করা জরুরী। পাশাপাশি নির্যাতনের শিকার সকলের জন্য সহায়ক ব্যবস্থার সৃষ্টি ও সংবেদনশীলতা নিশ্চিত করতে হবে।
পারিবারিক সহিংসতার অপর দিক
পুরুষদের বিরুদ্ধে পারিবারিক সহিংসতা একটি গুরুত্বপূর্ণ কিন্তু প্রায়শই উপেক্ষিত সমস্যা। এর প্রধান কারণ হলো পুরুষদের সর্বদাই শক্তিশালী ও অজেয় বলে চিহ্নিত করা প্রচলিত সামাজিক রীতি। এই ভুল ধারণাগুলো পুরুষ নির্যাতনের শিকারদের চুপ থাকার ক্ষেত্রে প্রভাব ফেলে। কারণ, অবিশ্বাস বা উপহাসের ভয়ে তারা প্রায়শই সাহায্য চাইতে বাধাগ্রস্ত হয়। তবে, বাস্তবতা হলো, পুরুষরাও নারীদের মতো নির্যাতনের শিকার হতে পারে এবং হয়। এই নির্যাতন চালাতে পারে তাদের স্ত্রী সঙ্গীনিও।
পুরুষরা যে ধরনের নির্যাতনের শিকার হন, তা বহুমুখী। এর মধ্যে শারীরিক নির্যাতন সবচেয়ে সহজে ধরা পড়ে। তবে, নির্যাতন শুধু শারীরিক আকারেই সীমাবদ্ধ থাকে না, এটা মানসিক ক্ষেত্রেও বিস্তৃত হয়। মানসিক নির্যাতন যেমন, কৌশলে ফাঁসানো, ভীতি দেখানো, এবং ক্রমাগত সমালোচনা করা, তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করা শারীরিক নির্যাতনের মতোই ক্ষতিকারক এবং মনে গভীর দাগ ফেলে। হতে পারে অর্থনৈতিক নির্যাতন, যেখানে নির্যাতনকারী নির্যাতিতের আর্থিক সম্পদ নিয়ন্ত্রণ করে।
পুরুষদের বিরুদ্ধে পারিবারিক সহিংসতার অস্তিত্ব স্বীকার করা হলো এই সমস্যা মোকাবিলায় প্রথম ধাপ। এমন সহযোগী পরিবেশ তৈরি করা জরুরী, যেখানে পুরুষ নির্যাতনের শিকাররা নিজেদের নিরাপদ মনে করে সাহায্য চাইতে এগিয়ে আসতে পারে। রীতি ও ধারণাগুলোকে চ্যালেঞ্জ করে এবং পারিবারিক নির্যাতনের বহুমুখী প্রকৃতি স্বীকার করে সমাজ এই সমস্যা সম্পর্কে আরও সামগ্রিক বোঝাপড়ার দিকে এগিয়ে যেতে পারে।
শারীরিক বনাম মানসিক নির্যাতন
শারীরিক নির্যাতন চোখে দেখা যায় বলে সহজে শনাক্ত করা যায়। এতে আঘাত, দাগ বা অন্যান্য শারীরিক জখম থাকতে পারে। এই ধরনের নির্যাতনের প্রমাণ স্পষ্ট থাকায়, সমাজ এটিকে সহজেই চিহ্নিত করে নিন্দা করে। কিন্তু, মানসিক নির্যাতন চোখে না দেখা গেলেও তা কম ক্ষতিকারক নয়। এই গোপনীয় নির্যাতনে কৌশল, ভীতি দেখানো, একাকীত্বে ফেলা এবং নিয়ন্ত্রণের মতো কৌশল ব্যবহার করা, যা একজন ব্যক্তির স্বমর্যাদাবোধ ও স্বাধীনতাকে ধীরে ধীরে নষ্ট করে দেয়।
মানসিক নির্যাতন হলো একটি ব্যাপক গোপন সহিংসতা। এতে ক্রমাগত সমালোচনা, অপমান, গ্যাসলাইটিং (এমন একধরণের কৌশল, যেখানে একজন ব্যক্তি আরেকজনকে এভাবে বিভ্রান্ত করে যে সে তার নিজের সঠিক বিবেচনা বা স্মৃতি সম্পর্কে প্রশ্ন করতে শুরু করে) এবং অন্যান্য ধরণের মানসিক কৌশল অন্তর্ভুক্ত থাকতে পারে, যা মারাত্মক উদ্বেগ, হতাশা এবং পোস্ট ট্রমাটিক স্ট্রেস ডিসঅর্ডারের (মানসিক আঘাতজনিত চাপ) জন্ম দিতে পারে। শারীরিক দাগ না থাকায় মানসিক নির্যাতন চিহ্নিত করা এবং মোকাবিলা করা বিশেষভাবে কঠিন। কারণ, এই ক্ষতি মানুষের মনে ও আত্মায় হয়।
মানসিক নির্যাতনের প্রভাব দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে। নির্যাতিতরা প্রায়শই দীর্ঘমেয়াদী মানসিক ও মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যায় ভোগে। সমাজের পক্ষে মানসিক নির্যাতনের গুরুত্ব স্বীকার করা এবং এই লক্ষণগুলো চিহ্নিত করে নির্যাতিতদের সাহায্য প্রদানের জন্য সমর্থন ব্যবস্থা গড়ে তোলা জরুরী। পারিবারিক সহিংসতা রোধে একটি সমন্বিত পদ্ধতি গড়ে তোলার ক্ষেত্রে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের ফলে যে ক্ষতি হয়, তার সমতা বোঝা জরুরী।
পারিবারিক সহিংসতার শিকার পুরুষদের চারপাশে বিদ্যমান কলঙ্ক
পারিবারিক সহিংসতার শিকার পুরুষদের ন্যায়বিচার ও সমর্থন লাভের পথে একটি প্রধান বাধা হলো তাদের চারপাশে বিদ্যমান কলঙ্ক। পুরুষদের অবিচল, সহিষ্ণু এবং অমোঘ বলে গড়ে তোলা সামাজিক ধারণা, পারিবারিক নির্যাতনের অভিজ্ঞতা প্রকাশ করতে তাদেরকে উল্লেখযোগ্যভাবে বাধা দেয়। এই ব্যাপক কলঙ্কের ফলে এ ধরনের ঘটনা খুব কমই রিপোর্ট করা হয়। কারণ, পুরুষরা সমাজের বিচার, পৌরুষত্ব হানি বা অবিশ্বাসের আশঙ্কায় থাকতে পারে।
পুরুষ নির্যাতনের শিকারদের প্রতি সামাজিক সমর্থনের অভাব তীব্র। নারী নির্যাতনের তুলনায় তাদের অভিজ্ঞতা কম গুরুত্বপূর্ণ বা কম ক্ষতিকারক বলে বিবেচনা করা হয়। এই ধারণার বৈষম্য পুরুষ নির্যাতনের শিকারদের একাকী করে তোলে। ফলে, নির্যাতনের পরবর্তী পরিস্থিতি মোকাবিলায় তাদের যথাযথ সমর্থন পাওয়া যায় না।
এই সব রীতি ও ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করা এবং এমন পরিবেশ গড়ে তোলা জরুরী, যেখানে পুরুষ নির্যাতনের শিকাররা কলঙ্কের ভয় ছাড়াই তাদের অভিজ্ঞতা খোলাখুলিভাবে বলতে পারবেন। এটি করার মাধ্যমে সমাজ নারী নির্যাতনের শিকারদের দেওয়া সহানুভূতি ও সহায়তা পুরুষ নির্যাতনের শিকারদের ক্ষেত্রেও প্রদান করতে শুরু করতে পারে। এতে নিশ্চিত হবে যে পারিবারিক সহিংসতার দ্বারা আক্রান্ত সকল ব্যক্তির কথা শোনা হবে, সমর্থন পাবে এবং তাদের অভিজ্ঞতা কাটিয়ে উঠতে সাহসী হবে।
নির্যাতনের লক্ষণ চিহ্নিতকরণ
পারিবারিক সহিংসতা লিঙ্গ নির্বিশেষে সবাইকে প্রভাবিত করে, এ বিষয়টি বোঝা সহিংসতা প্রতিরোধ ও মোকাবিলায় জরুরী। দুর্ভাগ্যজনকভাবে, এই সমস্যা লিঙ্গের গণ্ডি অতিক্রম করে যেকোনো লিঙ্গ পরিচয়ের ব্যক্তিকে আক্রান্ত করতে পারে। পারিবারিক সহিংসতা ঠেকাতে নির্যাতনের লক্ষণ চিহ্নিত করা একটি জরুরী পদক্ষেপ। এই লক্ষণগুলো শারীরিক হতে পারে, যেমন চোট বা আঘাত; কিংবা মানসিক হতে পারে, যেমন আচরণ বা মেজাজের পরিবর্তন, সামাজিক মেলামেশা এড়িয়ে চলা, এবং ভীতি বা উদ্বেগের প্রকাশ।
নির্যাতনের শিকারদের সহায়তা দেওয়া হলো পারিবারিক সহিংসতা মোকাবিলায় কার্যকর পদ্ধতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এই সহায়তা বিভিন্ন রূপ নিতে পারে। মনোযোগ দিয়ে শোনা থেকে শুরু করে, পেশাদার পরামর্শদাতা ও সেবার সাথে যোগাযোগ করতে সাহায্য করা পর্যন্ত এটি বিস্তৃত হতে পারে। নির্যাতনের শিকারদের অভিজ্ঞতা শেয়ার করার জন্য একটি নিরাপদ ও সমালোচনামুক্ত পরিবেশ তৈরি করা জরুরী।
সমাজ হিসেবে আমাদের নিজেদেরকে এবং অন্যদেরকে পারিবারিক সহিংসতার বিভিন্ন রূপ ও সকল নির্যাতনের শিকারদের সমর্থন করার গুরুত্ব সম্পর্কে শিক্ষিত করা দরকার। এটি করার মাধ্যমে, আমরা এমন একটি সংস্কৃতি গড়ে তুলতে পারি যেখানে নির্যাতন সহ্য করা হয় না এবং প্রত্যেকটি ব্যক্তির সুরক্ষা ও কল্যাণকে সর্বোচ্চ অগ্রাধান দেওয়া হয়।
উপসংহার
পুরুষরা পারিবারিক সহিংসতার শিকার হতে পারেন না, এমন ব্যাপক ধারণা ভিত্তিহীন এবং ক্ষতিকারক। পারিবারিক সহিংসতা হলো এমন একটি সমস্যা যা লিঙ্গ নির্বিশেষে সব মানুষ্যকেই প্রভাবিত করে। এই সত্যটি বোঝা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এটি সমতা ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার পথে বাধা সৃষ্টিকারী পক্ষপাত ও ভুল ধারণা দূর করতে সাহায্য করে। সমাজ হিসেবে আমাদের এমন একটি পরিবেশ গড়ে তোলার জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া জরুরী, যেখানে নির্যাতনের প্রতিটি শিকার, বিচার বা সন্দেহের শৃঙ্খল থেকে মুক্ত হয়ে সাহায্য চাইতে পারে।
সকল ধরণের পারিবারিক সহিংসতা নিয়ে আলোচনা বিস্তৃত করা এবং সকল নির্যাতনের শিকারদের জন্য সহায়তা ব্যবস্থা উন্নত করা জরুরী পদক্ষেপ। এটি করার মাধ্যমে, আমরা নিশ্চিত করতে পারি যে পারিবারিক সহিংসতা সম্পর্কিত আলোচনা সকলের অংশগ্রহণমূলক এবং সকল ব্যক্তির অভিজ্ঞতার প্রতিফলক। এইরকম সামষ্টিক স্বীকৃতি ও পদক্ষেপের মাধ্যমে আমরা এমন একটি সমাজ গড়ার আশা করতে পারি, যেখানে না শুধু পারিবারিক সহিংসতার বহুমুখী প্রকৃতি স্বীকৃত হবে, এতে আক্রান্ত প্রত্যেক ব্যক্তির জন্য নিরাপদ আশ্রয়স্থলও নিশ্চিত করা হবে।






Leave a comment